আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনার মধ্যেই রাশিয়ার ব্যাপক হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা অনেকটা অগ্রসর হয়েছে—এমন আভাস মিললেও ইউক্রেনের ওপর হামলা থামায়নি রাশিয়া। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতভর এক ব্যাপক সামরিক অভিযানে প্রায় ৪০০টি ড্রোন এবং বিভিন্ন ধরনের ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৬৭টি রুশ ড্রোন (ইউএভি) ধ্বংস করেছে। বিমানবাহিনীর বরাত দিয়ে ইউক্রেনীয় সংবাদ সংস্থা Ukrinform এ তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ৩৯২টি আক্রমণ নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে।
ধ্বংসকৃত অস্ত্রের বিস্তারিত তালিকা:
- ২০টি বি-১০১ এয়ার-লঞ্চড ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র
- চারটি ইস্কান্দার-কে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র
- একটি বি-৫৯/৬৯ গাইডেড এয়ার-লঞ্চড ক্ষেপণাস্ত্র
- ৩৬৭টি বিভিন্ন ধরনের ড্রোন (শাহেদ, গেরবেরা ও ইতালমাসসহ)
তবে সব হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৮টি হামলাকারী ড্রোন ১৩টি ভিন্ন স্থানে আঘাত হেনেছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ হামলাকে "সমন্বিত আক্রমণ" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিতভাবে ইউক্রেনের জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যেই এ হামলা চালানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জেলেনস্কি বলেন, "জীবনের বিরুদ্ধে পরিচালিত এসব হামলার জবাব দিতে হবে এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের জন্য মস্কোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।" তার মতে, ন্যায়বিচার ও কঠোর অবস্থান নিশ্চিত হলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হবে। এজন্য রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি দ্রুত ও ধারাবাহিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
অন্যদিকে, আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জেনেভায় মার্কিন প্রতিনিধিদল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও পৃথক বৈঠক করবে বলে জানা গেছে। এই বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে ২৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইউক্রেনকে চূড়ান্ত শর্ত দেয় রাশিয়া। শর্ত অনুযায়ী, ইউক্রেনকে পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। পরবর্তীতে আবুধাবিতেও আরেক দফা ত্রিদেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবনা রয়েছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ইউক্রেনের ক্রিমিয়া, লুহান্সক ও দোনেৎস্ক অঞ্চলকে 'কার্যত রুশ ভূখণ্ড' হিসেবে স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক পক্ষ।
এই পরিকল্পনায় আরও প্রস্তাব করা হয়েছে:
- ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর আকার সীমিত করা
- ধাপে ধাপে মস্কোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বহুপাক্ষিক আলোচনা
এই সাম্প্রতিক হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করছেন। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি রাশিয়ার সামরিক শক্তির ব্যাপকতাও এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিভাবে শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া যায় এই রকম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে।
