গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরম অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও চীনকে তেল বিক্রির মাধ্যমে টিকে ছিল ইরানের ইসলামি সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তিকেও গেরিলা যুদ্ধকৌশল দিয়ে মোকাবিলা করে এসেছে তারা। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এবার মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধের মুখে পড়ার পর ইরানের পুরোনো কৌশলগুলো আর কাজ করছে না।
হরমুজ প্রণালি সংকট
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে হামলা চালিয়ে তেহরান ভেবেছিল তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ওই সময় জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশের সরবরাহ ব্যাহত হয়। কিন্তু যুদ্ধের ছয় সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সবগুলো বন্দর থেকে পণ্য ও তেল পরিবহন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে এর জবাব দেয়।
ছায়া জাহাজের নেটওয়ার্ক অচল
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে ইরানের ছায়া জাহাজের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই জাহাজগুলো সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান গোপন রেখে গোপনে চীনে তেল পাচার করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াত। কিন্তু এখন এই ট্যাঙ্কারগুলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কড়া পাহারা ভেদ করতে পারছে না। মার্কিন বাহিনী তাদের তাড়া করে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের পারস্য উপসাগরীয় নীতিবিষয়ক সাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোচেস বলেন, ইরান বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করতে পেরেছিল। তবে বিঘ্ন সৃষ্টি করা আর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। মার্কিন অবরোধের কারণে তারা এখন চরম এক বাস্তবতার মুখোমুখি। ইরান বর্তমানে বিকল্প পথে রেলযোগে চীনে কিছু তেল পাঠাতে এবং ককেশাস ও পাকিস্তান থেকে সড়কপথে খাদ্যসামগ্রী আমদানির চেষ্টা করছে। তবে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ফার্স নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে বৃহস্পতিবার ইরানিয়ান শিপিং অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, দেশটির মোট বাণিজ্যের মাত্র ৪০ শতাংশ অবরুদ্ধ বন্দরগুলো থেকে অন্য পথে ঘুরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
রাজনৈতিক ফাটল
এই চরম সংকট ইরান সরকারের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেও ফাটল ধরিয়েছে। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো মধ্যপন্থিদের সঙ্গে কট্টরপন্থিদের তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে। কট্টরপন্থি শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সাঈদ জলিলি।
মধ্যপন্থিদের দৃষ্টিভঙ্গি
মধ্যপন্থিরা মনে করেন, এখন পাল্টা হামলা বন্ধ রেখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করে একটি অনুকূল চুক্তিতে আসা উচিত। তাদের ধারণা, ট্রাম্পও যত দ্রুত সম্ভব এই ঝামেলাপূর্ণ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান। পাশাপাশি, যুদ্ধের শুরুতে ইরানিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী জোয়ার দেখা গেলেও এখন তারা এই সংঘাত নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে বলে মধ্যপন্থিরা আশঙ্কা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি অ্যাট চ্যাটানুগা-তে ইরান বিষয়ক গবেষক সাঈদ গোলকার বলেন, এই অচলাবস্থা ভাঙতে সরকারকে কিছু একটা করতেই হবে। মধ্যপন্থিরা একটি চুক্তি চান, কারণ তারা মনে করেন আরও ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল।
কট্টরপন্থিদের অবস্থান
অন্যদিকে, কট্টরপন্থিদের একটি বড় অংশ মনে করে, ইরানকে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সরাসরি যুদ্ধ শুরু করতে হবে। এতে তেলের দাম অনেক বেড়ে যাবে এবং ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। তাদের যুক্তি হলো, এই অবরোধ ইরানের ওপর আগে জারি করা নিষেধাজ্ঞার চেয়েও অনেক বেশি এবং এটি এক ধরনের যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার শামিল, যার সামরিক জবাব দেওয়া উচিত।
খামেনির হুমকি
বৃহস্পতিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে এক নতুন হুমকি দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক উপস্থাপকের পাঠ করা লিখিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, যেসব বিদেশিরা মন্দ কাজ করে, তাদের স্থান হবে জলের গভীরে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি হামলায় বাবা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তবে এরপর থেকে তাকে এখনও জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
যুদ্ধের নতুন মাত্রা
জার্মানিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসডব্লিউপি-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেন, তেহরান এখন এই অবরোধকে যুদ্ধের বিকল্প হিসেবে দেখছে না, বরং এটি যুদ্ধেরই অন্য রূপ। এর ফলে ইরানের নীতিনির্ধারকরা খুব শিগগিরই ভাবতে পারেন যে, দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ সহ্য করার চেয়ে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষতি তুলনামূলক কম।
সামরিক প্রস্তুতি
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, তেহরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে হামলা চালাতে সাবমেরিন থেকে শুরু করে মাইন বহনকারী ডলফিনের মতো আগে কখনও ব্যবহার না করা অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রের তলদেশের ফোন কেবল কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এটি করা হলে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেবলের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এটিকে এই অঞ্চলের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার একটি পরোক্ষ সতর্কতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক প্রস্তাব
গত সপ্তাহান্তে তেহরান আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, ইরানি বন্দরের ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক আলোচনা স্থগিত করার বিনিময়ে তারা হরমুজ প্রণালিতে আক্রমণ বন্ধ করবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সোমবার তার উপদেষ্টাদের দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যা ইরান তার পারমাণবিক দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। পরে চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, এই অবরোধ দারুণ এক বুদ্ধি, এটি শতভাগ নির্ভুলভাবে কাজ করেছে।
অবরোধের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম তদারককারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ইরানের হয়ে কাজ করা প্রায় ৪৪টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ফিরে যাওয়ার অথবা বন্দরে ফেরত আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পণ্য-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, কোনও ইরানি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন অবরোধ পেরিয়ে চীন বা অন্য কোনও ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পেরেছে, এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি বলেছেন, তেহরান নৌ-পরিবহনের ওপর এই ‘নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর’ করার উপায় খুঁজে বের করবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন বোমাবর্ষণে ইরানের ঐতিহ্যবাহী নৌবাহিনীর প্রায় ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর মুখোমুখি হতে সম্পূর্ণ অক্ষম।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ইরানি নেতৃত্বের ধারণা, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা কমাতে এবং আমেরিকার বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে নতি স্বীকার করবে এবং অবরোধ তুলে নেবে। অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে ইরানই আগে আত্মসমর্পণ করবে।
এই যুদ্ধের ফলে ইরানের অর্থনীতিতে বিশাল ধাক্কা লেগেছে। দেশটিতে ১০ লক্ষাধিক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী এবং দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অনলাইন ব্যবসাগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। সংকটে পড়া দেশটির অর্থনীতি এখন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত এক বছরে ইরানি মুদ্রার মান অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। মার্কিন অবরোধ অবসানের কোনও লক্ষণ না থাকায় সম্প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হার ১৮ লাখ ১০ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল



