তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছেন, যদিও তেহরানের পক্ষ থেকে এমন কোনো অনুরোধ করা হয়নি। ট্রাম্প নিজের ইচ্ছাতেই একতরফাভাবে এই ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে কেবল শান্তির চেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এর পেছনে আরও গভীর কারণ রয়েছে। এটি মূলত ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশলের ব্যর্থতা। ইরানকে ভয় দেখিয়ে বশ করা যাচ্ছে না, ফলে ইরানের ওপর শক্তি খাটানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সেই অসহায়ত্বই ফুটিয়ে তুলেছে।
কৌশলগত পিছুটান
এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে হোয়াইট হাউস আসলে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। তারা বুঝে গেছে, এখন আর গায়ের জোরে সব শর্ত চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি একধরনের 'কৌশলগত পিছুটান'। যুদ্ধের বিভিন্ন দিক যাচাই করে যুক্তরাষ্ট্র দেখেছে, এই যুদ্ধে তাদের জেতার সম্ভাবনা খুব কম। ইরানের পাল্টা হামলা চালানোর দারুণ সক্ষমতা আছে। তারা নিজের দেশের সম্পদ রক্ষা করতে জানে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে থাকা আঞ্চলিক মিত্রদের শক্তিও অনেক বেশি। এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার খরচ অনেক বেড়ে গেছে, এবং এই বিশাল চাপ সামলানো এখন ওয়াশিংটনের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে অচল করে দিতে, কিন্তু এই কৌশলের এখন একটা সীমা আছে। কারণ, এখন পরিস্থিতি আগের মতো নেই। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে ইরানের সরাসরি প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা আছে।
যুদ্ধবিরতির আড়ালে গুপ্ত হামলার সম্ভাবনা
মার্কিন ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সাময়িক বিরতি দেয়। এই যুদ্ধবিরতির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা কোনো গোপন হামলা চালাতে পারে। ইরান এই কৌশল সম্পর্কে বেশ সচেতন। তারা এই সম্ভাবনাকে মোটেই হালকাভাবে দেখছে না। তারা যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আছে। সহজ কথায়, এই বিরতি কোনো শান্তির সংকেত নয়; এটি সম্ভবত নতুন করে শক্তি গুছিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ মাত্র।
ইসরায়েলের ভূমিকা ও ইরানের দৃঢ়তা
এই পুরো পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি লড়াই থেকে দূরে থাকতে চাইছে। এর বদলে তারা ইসরায়েলকে সামনে রেখে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। লেবানন সংকটের মতো নানা অজুহাত তুলে তারা ইসরায়েলকে ব্যবহার করতে পারে। নিজেদের ক্ষতি এড়াতে অন্যকে দিয়ে যুদ্ধ করানো আমেরিকার পুরোনো অভ্যাস। কিন্তু ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই চাল মানবে না। তাদের মতে, হামলা ইসরায়েল করলেও তার দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে। তারা এই দুই পক্ষকে আলাদা করে দেখছে না।
হরমুজ প্রণালি: শক্তির চাবিকাঠি
পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো হরমুজ প্রণালি। এই সমুদ্রপথ এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে। সারা বিশ্বের তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পারাপার হয়, তাই ইরান এটিকে বড় একটি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অবরোধের পাল্টা জবাব দিতে ইরান এই পথকেই বেছে নিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে যে তারা এই পথ খুলে দেবে না; প্রয়োজন হলে তারা এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। এর ফলে সারা বিশ্বের জ্বালানিব্যবস্থা বড় বিপদে পড়বে। তাই এই লড়াই আর কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্ব অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র চায় যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে অচল করে দিতে, কিন্তু এই কৌশলের এখন একটা সীমা আছে। কারণ, এখন পরিস্থিতি আগের মতো নেই। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে ইরানের সরাসরি প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা আছে। ফলে ইরানকে চাপে রাখতে গিয়ে অশান্তি জিইয়ে রাখলে কেবল তাদেরই ক্ষতি হবে না; এতে পশ্চিমা দেশগুলোসহ পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ ইরানের ক্ষতি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিজেরাই বিপদে পড়তে পারে।
শক্তির নতুন ভারসাম্য
বিশ্বজুড়ে শক্তির চিরাচরিত ধারা বদলে যাচ্ছে। ইরান এখানে কেবল বসে থাকা কোনো দুর্বল পক্ষ নয়; তারাই এখন যুদ্ধের নতুন নিয়ম ঠিক করছে। তারা এই যুদ্ধবিরতিকে কারও দয়া হিসেবে দেখছে না, তাই নিজেদের সামরিক শক্তিও তারা কমিয়ে দেয়নি। এতে শক্তির এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। এখন চাইলেই কেবল ইরানের ওপর যুদ্ধের সব ক্ষতি বা দায় চাপিয়ে দেওয়া যাবে না; যুক্তরাষ্ট্রকেও এর মাশুল গুনতে হবে।
উপসংহার
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ক্ষমতার কোনো লক্ষণ নয়; বরং এটি পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ হারানোর এক বড় সংকেত। এই অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধবিরতি প্রমাণ করে যে আমেরিকার শক্তিরও একটি সীমা আছে। এখন বড় প্রশ্ন এটি নয় যে যুদ্ধ চলবে কি না; বরং আসল প্রশ্ন হলো—এত দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি শেষ পর্যন্ত কার হাতে টিকে আছে?
সায়িদ মার্কোস তেনোরিও, ইতিহাসবিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।



