জাপানে ভালুকের আক্রমণে বাড়ছে হতাহত, আতঙ্কে উত্তরাঞ্চল
জাপানে ভালুকের আক্রমণে হতাহত বাড়ছে, আতঙ্কিত উত্তরাঞ্চলবাসী

জাপানে ভালুকের আক্রমণে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি

ভালুক—নামটি শুনলে সবার প্রিয় ‘টেডি বিয়ার’ কিংবা ‘ডিজনি’র বিখ্যাত চরিত্র ‘উইনি দ্য পুহ’-এর ছবি চোখে ভেসে ওঠে। সব সময় মধু খেতে চাওয়া এই চরিত্র নিজের সারল্য দিয়ে মুগ্ধ করে রাখে শিশুদের, বড়দেরও। রাজধানী টোকিওসহ জাপানে একাধিক ডিজনি স্টোর রয়েছে। এ সুবাদে ‘উইনি দ্য পুহ’–এর ভক্ত কম নেই।

তবে জাপানে এখন ভালুকের কথা উঠলে কেবল স্নিগ্ধ অনুভূতি নয়, শিরদাঁড়া বেয়ে আতঙ্কের স্রোত নেমে আসে; বিশেষত দেশটির উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের কাছে। কয়েক বছর ধরে একের পর এক ভালুকের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। বাড়ছে হতাহত মানুষের সংখ্যা। এ বছরও ভালুকের আক্রমণে প্রথম প্রাণহানির খবর মিলেছে। এতে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

এপ্রিলেই তিন প্রাণহানি

ঘটনাটি গত ২১ এপ্রিলের, জাপানের উত্তরাঞ্চলের ইওয়াতে জেলার শিওয়া এলাকা থেকে ৫৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ বছর ভালুকের আক্রমণে নিহত হওয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এটা নিশ্চিত করেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এদিকে ইওয়াতের পাহাড়ি এলাকায় আরেক নারীর মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে। তিনিও ভালুকের আক্রমণে নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত শুক্রবার জাপানের গণসম্প্রচার কেন্দ্র এনএইচকে পুলিশের বরাত দিয়ে এ খবর প্রচার করেছে।

জানা গেছে, ইওয়াতে জেলার হাচিমান্তাই শহরের বাসিন্দা ৬৯ বছর বয়সী ওই নারী গত বুধবার একটি পাহাড়ি জঙ্গলে বুনো ভোজ্য উদ্ভিদ সংগ্রহের জন্য রওনা হয়েছিলেন। পরদিন সকালে পুলিশ ও উদ্ধারকারীরা তাঁর মরদেহ খুঁজে পান। তাঁর মুখ ও মাথায় নখের আঘাত ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জাপানের কিয়োদো নিউজ জানায়, ইওয়াতের এ দুটি ঘটনার বাইরে ইয়ামাগাতার সাকাতা এলাকার একটি জঙ্গলে ৭৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া গেছে। ওই ব্যক্তির মাথা ও হাতে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। মরদেহটি যেখানে খুঁজে পাওয়া গেছে, তার পাশের জঙ্গল থেকে একটি ভালুক বেরিয়ে এসেছিল। একজন শিকারি তৎক্ষণাৎ প্রাণীটিকে হত্যা করেন।

এই তিন ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর ভালুকের প্রাণঘাতী আক্রমণ সময়ের আগেই ঘটছে। গত বছর প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটে জুনের শেষের দিকে। এবার এপ্রিলে। শেষের দুজনের মৃত্যুর কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। নিশ্চিত করা হলে এপ্রিলেই ভালুকের আক্রমণে নিহত মানুষের সংখ্যা হবে ৩।

সর্বকালের সর্বোচ্চ হতাহত

ভালুকের আক্রমণের ঘটনা কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মার্চে শেষ হওয়া ২০২৫ অর্থবর্ষে জাপানজুড়ে ভালুকের আক্রমণে হতাহত মানুষের সংখ্যা সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছায়। আহত হন ২৩৮ জন। নিহত ১৩ জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ইওয়াতে জেলায়, চারজন আকিতায়, দুজন হোক্কাইডো এবং একজন করে মিয়াগি ও নাগানোতে প্রাণ হারিয়েছেন।

এর আগে ২০২৩ অর্থবর্ষে জাপানে ভালুকের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি, ছয়জনের, মৃত্যু হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন ২১৯ জন।

শীতনিদ্রা ও সময়ের তারতম্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার এত আগেই প্রাণহানি ঘটার কারণ ভালুকের শীতনিদ্রা থেকে দ্রুত জেগে ওঠা।

জাপানে ভালুকেরা বসন্তকাল পর্যন্ত গাছে বা গুহায় শীতনিদ্রার জন্য আশ্রয় নেয়। এ জন্য প্রাণীটি শরতে প্রচুর খাবার খায়। মূলত জাপানের হোক্কাইদো জেলার বাদামি ভালুক এবং উত্তর-পূর্ব জাপানের এশীয় প্রজাতির কালো ভালুক এ নিয়ম মেনে চলে। অন্যদিকে ইওয়াতে জেলার এশীয় প্রজাতির কালো ভালুকেরা নভেম্বরের শুরুতে শীতনিদ্রা বেছে নেয়। পরের বছরের মে মাসের শুরু পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে।

শীতকালে খাবারের সংকট থাকে। এ জন্য ভালুক ওই সময়টা ঘুমিয়ে কাটাতে পছন্দ করে। শরীরে সঞ্চিত চর্বি ভালুকের শক্তির উৎস হিসেবে তখন কাজ করে। ঘুম থেকে জেগে উঠে গুহা থেকে ভালুকের বেরিয়ে আসার ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না।

বিশ্লেষকেরা বলেন, শীত কম পড়লে ভালুক শীতনিন্দ্রা থেকে জেগে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। আবার যেসব ভালুক শরতে যথেষ্ট খাবার পায়নি, দীর্ঘ এ ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেনি, সেগুলোও শীতনিদ্রায় না গিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে। এসব ভালুকের কিছু মাংসাশী।

মাংসাশী ও শহুরে ভালুক

ভালুকবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাদামের মতো খাবার পর্যাপ্ত থাকলেও কিছু ভালুক মাংস খেতে পছন্দ করে। এমন কিছু ভালুক শীতনিদ্রায় না গিয়ে তীব্র শীতের মধ্যে প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। শীতের সময় শিকার ধরা কঠিন। শিকারও পর্যাপ্ত মেলে না। ফলে ক্ষুধার্ত ভালুকের মেজাজ থাকে চড়া। তখন এরা মানুষ পেলে আক্রমণ করে বসে। জাপানজুড়ে মানুষের ওপর আক্রমণ করা ভালুকের মধ্যে এ প্রজাতিও রয়েছে।

তবে ‘শহুরে’ ভালুক এখন জাপানবাসীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের ঘনবসতিপূর্ণ শহর ও নগর কেন্দ্রগুলোয় দেখা যায়। এরা মানুষের সংস্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। পাহাড় থেকে নেমে এসে বাড়িতে গৃহস্থালির আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটি করতেও এদের দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যেসব ভালুক মানববসতিতে ঢুকে পড়েছিল, ওরা শিখে গেছে যে মানুষের বাড়িতে গেলে খাবার পাওয়া যাবে। খাবার নিয়ে নির্বিঘ্নে পাহাড়ি ডেরায় ফেরা যাবে। তাই অনায়াসে ভালুক খাবার খুঁজতে বসতিতে চলে আসে। ভালুকগুলো মানুষকে বিপজ্জনক হিসেবেও দেখছে না।

শীতনিদ্রা শুরুর আগে খাবারের সন্ধানে ভালুকেরা এলেও বসন্তকালে নিদ্রাভঙ্গের পর মানববসতির কাছাকাছি ওদের দেখা পাওয়া বিরল। এর কারণ, ওই সময় ভালুকেরা সাধারণত খাবারের জন্য পাহাড়ি পাতা ও বুনো গাছপালার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এবার ঘটেছে ব্যতিক্রম।

সময়ের আগেই হাজির

এ বছরের এপ্রিল মাসেই উত্তর-পূর্ব জাপানের তোহোকু অঞ্চলের শহুর এলাকায় ভালুকের উপস্থিতির খবর জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। গত ১৯ এপ্রিল সেন্দাইয়ের একটি আবাসিক এলাকায় সকাল থেকেই অ্যাপার্টমেন্ট ভবন প্রাঙ্গণে ঝোপের মধ্যে একটি ভালুক ঘোরাঘুরি করছিল। পরে চেতনানাশক বন্দুক দিয়ে ভালুকটিকে বাগে আনা হয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনাটি ঘটেছে শহরের মূল স্টেশনের একেবারে কাছাকাছি জায়গায়। কাজেই জনবহুল এলাকায় ভালুকের চলে আসায় স্থানীয় লোকজন বেশ উদ্বিগ্ন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ অর্থবছরে জাপানজুড়ে যতগুলো ভালুকের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল, তার দুই–তৃতীয়াংশ ঘটেছিল এই তোহোকু অঞ্চলে। এবারের বসন্তে সেখানে অনেক আগে থেকেই বেশি হারে ভালুকের দেখা মিলছে।

গত বছরের তুলনায় এবার জাপানের আওমোরি জেলায় ১১ দিন, আকিতা জেলায় ২৪ দিন, ইওয়াতে জেলায় দুই মাস এবং মিয়াগি জেলায় তিন মাসের বেশি সময় আগে ভালুকের উপস্থিতিসংক্রান্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

আক্রমণ বাড়ার কারণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে ভালুকের আক্রমণ আকস্মিক বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর একটি বাদামের ফলন কমে যাওয়া। এর ফলে ক্ষুধার্ত ভালুকেরা খাবারের সন্ধানে শহর বা পর্যটন এলাকায় হানা দিচ্ছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতকাল উষ্ণতর হওয়ায় ভালুকের শীতনিদ্রার সময়েও তারতম্য ঘটছে। এটি মানুষের সঙ্গে ভালুকের সাক্ষাতের সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জাপানের গ্রামগুলোয় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি। তাঁদের অনেকেই বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে পারেন না। লোকালয়ের আশপাশের মাঠগুলো আগাছায় ভরা থাকে। এসব জায়গাও ভালুকের চারণভূমি হয়ে উঠছে।

জাপানে শিকারের লাইসেন্স আর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মকানুনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ভালুকের এবং আক্রমণের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটাও ভূমিকা রাখছে।

উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপাতত সমাধান হিসেবে জাপান সরকার ভালুকপ্রবণ অঞ্চলে গুলি চালানোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পাশাপাশি টহল বাড়ানোর ওপর জোর দিতে চাইছে।

ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা

ভালুকের আক্রমণ ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জাপানের উত্তরাঞ্চলের পর্যটন ব্যবসায়ীরা। গত শরৎ থেকে ওই অঞ্চলে পর্যটকের ভিড় কমে গেছে। তাই এবারের উষ্ণ মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজক এবং পর্যটন ব্যবসায়ীরা ভালুক–প্রতিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন।

মাইনিচি শিম্বুন জানাচ্ছে, এপ্রিলের শেষের দিকে ফুকুশিমায় অনুষ্ঠিত একটি ম্যারাথন ইভেন্ট থেকে ভালুক দূরে রাখতে আতশবাজি ব্যবহার করা হয়েছিল। আবার গত মাসে চেরি ফুল দেখার মৌসুমে দর্শনার্থীদের নিরাপদ রাখতে ইওয়াতে জেলার একটি পার্কের ওপর বিশেষ ড্রোন ওড়ানো হয়।

ইয়ামাগাতার ক্যাম্পিং প্রতিষ্ঠানগুলো ভালুক তাড়ানোর জন্য উচ্চ স্বরে গান বাজানোর পরিকল্পনা করেছে। কোথাও কোথাও ভালুকের উপস্থিতি শনাক্তে ড্রোনের ব্যবহার এবং বৈদ্যুতিক বেড়া স্থাপন করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তা রয়েছে।