আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর দক্ষিণ মেরু বা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ বর্তমানের মতো বরফে ঢাকা ছিল না। তখন এটি ছিল একটি সবুজ ও চমৎকার আবহাওয়ার অঞ্চল। কিন্তু প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে মহাদেশটি হঠাৎ জমে বরফ হতে শুরু করে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫ কিলোমিটার পুরু বরফের স্তর জমে আছে। অথচ পৃথিবীর উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চল আরও আড়াই কোটি বছর পর পর্যন্ত জমে বরফ হয়নি।
দুই মেরুর বরফ জমার সময়ের পার্থক্যের কারণ
দুই মেরুর বরফ জমার এই বিশাল সময়ের পার্থক্যের কারণ জানতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন। সম্প্রতি এক গবেষণায় তাঁরা সেই কারণ জানতে পেরেছেন। গত ২ জুলাই আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স থেকে প্রকাশিত সায়েন্স জার্নালে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল
গবেষকেরা কম্পিউটারের বিশেষ মডেল ব্যবহার করে কোটি কোটি বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকার মাটির গঠন কীভাবে বদলেছে, তা পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, একটি শক্তিশালী ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার একটি পর্বতমালা হঠাৎ ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার নাম ম্যান্টল ওয়েভস বা ভূ-অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ। এটি পৃথিবীর গভীরে ঘটে যাওয়া এক ধরনের ধীরগতির আলোড়ন, যা কোনো মহাদেশ ভেঙে আলাদা হওয়ার সময় তৈরি হয়। এই তরঙ্গগুলো মাটির নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটের তলা থেকে ভারী ও ঘন শিলাগুলোকে সরিয়ে দেয়, ফলে ওপরের মহাদেশটি ওজনে হালকা হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে।
গাম্বুরৎসেভ পর্বতমালার ভূমিকা
এই ভূ-অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ যখন অ্যান্টার্কটিকার মাটির নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, তখন সেখানে একটি বিশাল মালভূমি তৈরি হয়। এই মালভূমির ওপরেই গড়ে ওঠে গাম্বুরৎসেভ নামে এক বিশাল পর্বতমালা, যা পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। পর্বতমালাটি প্রায় ১১ হাজার ১২০ ফুট উঁচু হলেও আজ তা সম্পূর্ণ বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে। পর্বতমালাটি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে যায়, যেখানে ঠান্ডায় হিমবাহ তৈরি হওয়া ও স্থায়ীভাবে বরফ জমে থাকা খুব সহজ ছিল। ফলে তখনকার বৈশ্বিক তাপমাত্রা আজকের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব অ্যান্টার্কটিকায় বরফ জমতে থাকে।
ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ও সময়কাল
এই গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী টমাস গারনন জানান, প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে মহাদেশগুলো আলাদা হওয়ার প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। আর সেটাই ঠিক করে দিয়েছিল পৃথিবীর প্রধান বরফের স্তরগুলো ঠিক কখন এবং কোথায় তৈরি হবে। এই প্রক্রিয়ার কারণেই আজ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকায় প্রথম বরফ জমতে শুরু করে। তখন পৃথিবীতে ইওসিন যুগ শেষ হয়ে অলিগোসিন যুগ শুরু হচ্ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবী তার পুরোনো গরম আবহাওয়া পেরিয়ে বর্তমানের এই শীতল যুগে প্রবেশ করে।
উত্তর মেরুর ভিন্নতা
অন্যদিকে উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের গল্পটা ভিন্ন। সেখানে অ্যান্টার্কটিকার মতো শক্ত মাটি বা পাহাড় নেই; এটি মূলত একটি মহাসাগর। উঁচু পাহাড় না থাকায় সেখানে সহজে বরফ জমতে পারেনি। তাই সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি নিচু এলাকায় স্থায়ী বরফ জমার জন্য বাতাস আরও অনেক বেশি ঠান্ডা হওয়ার প্রয়োজন ছিল। তা তখনই সম্ভব হয়েছিল, যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ অনেক কমে যায়। এ কারণেই দক্ষিণ মেরুর প্রায় আড়াই কোটি বছর পর উত্তর মেরু বরফে ঢেকে যায়।
গবেষণার তাৎপর্য
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ও এই গবেষণার অন্যতম গবেষক থিয়া হিঙ্কস বলেন, 'আমাদের এই গবেষণাটি দেখায় যে জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে মাটির গঠন বা উচ্চতা বদলে গেলে তা প্রকৃতির ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।' গবেষকদের মতে, এই তরঙ্গের কারণে হওয়া মাটির ক্ষয় ও পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠে যাওয়ার প্রক্রিয়াই অ্যান্টার্কটিকার ভূখণ্ডকে ধীরে ধীরে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে বরফ গলে না গিয়ে স্থায়ী রূপ নিতে পারে।



