ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। জুনের শেষ সপ্তাহে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। প্যারিসের ত্রোকাদেরো চত্বর, লুক্সেমবার্গ পার্ক ও সেঁন নদীর তীরে মানুষ ছায়া ও শীতলতার জন্য হাঁসফাঁস করছেন।
প্যারিসের রূপ বদলেছে
সাধারণত পর্যটকে ভরা ত্রোকাদেরো চত্বরে এখন অনেকেই গাছের ছায়ায় বসে আছেন, মাথায় ভেজা কাপড় চেপে রেখেছেন। রাস্তার পাশের পানির ফোয়ারাগুলোর চারপাশে শিশুদের ভিড়। হাতে পানির বোতল নিয়ে পর্যটকেরা বারবার মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন। প্যারিস মেট্রোর স্টেশনগুলোতেও একই চিত্র—বাতাস ভারী, গরম আর আর্দ্রতায় যাত্রীরা হাতপাখা ব্যবহার করছেন।
শহরের বিভিন্ন পার্কে এখন মানুষ ছায়া খুঁজছে। লুক্সেমবার্গ পার্কের ছায়াময় অংশে বেঞ্চগুলো প্রায় পূর্ণ। ঘাসের ওপর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন অনেকে। সেঁন নদীর তীরে সন্ধ্যা নামার পর মানুষের উপস্থিতি বাড়ছে, দিনের তাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে নদীর বাতাসের আশায় জড়ো হচ্ছেন।
অবকাঠামো সংকট
বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে ৪০ বা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস খুব অস্বাভাবিক মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু প্যারিসে এই তাপমাত্রা একধরনের সামাজিক ও অবকাঠামোগত সংকট তৈরি করে। কারণ, শহরটি গড়ে উঠেছে শীত মোকাবিলার জন্য, গরমের জন্য নয়। সিংহভাগ আবাসিক ভবনে এখনো শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। দিনের তাপ দেয়াল ও ছাদে জমে থাকে, ফলে রাতেও ঘর সহজে ঠান্ডা হয় না।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ডেলিভারি রাইডার কিংবা বিভিন্ন সেবা খাতের কর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের মধ্যে কাজ করছেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত তাপ শরীরে পানিশূন্যতা, ক্লান্তি, মাথাঘোরা ও গুরুতর ক্ষেত্রে হিটস্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
ফরাসিদের কাছে তাপদাহের স্মৃতি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০০৩ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হানে। ফ্রান্সে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে সরকারি হিসাব জানায়। একা বসবাসকারী বয়স্ক মানুষদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই ঘটনার পর ফ্রান্স সরকার তাপপ্রবাহ মোকাবিলার জন্য বিশেষ সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করে।
তবু জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিস্থিতি ক্রমেই আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সালে প্যারিসে প্রথমবারের মতো ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল। তখন অনেকেই একে ব্যতিক্রমী ঘটনা মনে করেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে নতুন নতুন তাপপ্রবাহ দেখিয়ে দিয়েছে যে এটি এখন নিয়মিত ঘটনা।
প্যারিসে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকের কাছেও এবারের গরম অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, ঢাকার গরমের সঙ্গে পরিচিত হলেও প্যারিসের এই পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ, এখানে গরম মোকাবিলার প্রস্তুতি ও সামাজিক অভ্যাস নেই বললেই চলে। বিশেষ করে পুরোনো ভবনগুলোতে বসবাসকারীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
নগর পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ
প্যারিসের আধুনিক রূপের স্থপতি জেওরজ উজেন হোসমান উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শহরটিকে নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন। সম্রাট নেপোলিয়নের নির্দেশে নির্মিত প্রশস্ত সড়ক, গাছঘেরা বুলেভার্ড ও বিস্তৃত পার্কগুলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবনের মানোন্নয়নের জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সময়ের নগর–পরিকল্পনাবিদেরা কল্পনাও করেননি যে একদিন প্যারিসকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সঙ্গে লড়াই করতে হবে।
আজকের প্যারিস পৃথিবীর পরিবর্তিত আবহাওয়ার এক গল্প। যে শহর একসময় বৃষ্টির জন্য বিখ্যাত ছিল, সেই শহর এখন আগুনঝরা দিনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইতিহাসের পথে প্যারিস বহু পরিবর্তনের সাক্ষী, রাজতন্ত্রের পতন, বিপ্লব, যুদ্ধ, পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন। কিন্তু জলবায়ুর এই পরিবর্তন হয়তো সেই সব পরিবর্তনের চেয়েও গভীর। কারণ, এর প্রভাব সীমাবদ্ধ নয় কোনো একটি শহর বা দেশের মধ্যে।



