উপকূলের নারীদের জীবন বদলে দিল জিসিএ প্রকল্প: নিরাপদ পানি ও জীবিকায়নে নতুন সম্ভাবনা
উপকূলের নারীদের জীবন বদলে দিল জিসিএ প্রকল্প

উপকূলের নারীদের জীবন বদলে দিল জিসিএ প্রকল্প: নিরাপদ পানি ও জীবিকায়নে নতুন সম্ভাবনা

খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বাসিন্দা আম্বিয়া খাতুনের জন্য প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথম চিন্তা ছিল খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা। নিরাপদ পানির অভাবে তাঁকে দূরের উৎস থেকে পানি আনতে হতো, যা শারীরিক ক্লান্তি ও অসুস্থতার কারণ হতো। শুকনো মৌসুমে পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো। আম্বিয়া বলেন, "এমন দিনও গেছে যখন পানির অভাবে রান্না করা সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটতে হতো, যা শরীরকে ক্লান্ত করে দিত।"

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পরিবর্তনের সূচনা

কিন্তু সেই কষ্টের দিন এখন অতীত। জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন (জিসিএ) প্রকল্পের মাধ্যমে আম্বিয়ার বাড়ির উঠানে দুই হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পানির আধার স্থাপন করা হয়েছে। এখন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সারা বছর নিরাপদ পানির নির্ভরযোগ্য উৎস পেয়েছেন তিনি। পানি আনতে সময় ব্যয় না করে, তিনি এখন উৎপাদনমূলক কাজে মনোযোগ দিচ্ছেন। ২০২১ সালে জিসিএ প্রকল্প থেকে সবজিবাগান বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি নিজের উঠানে লাউ, লালশাক, মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি চাষ শুরু করেছেন। এটি তাঁর পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছে এবং অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে আয়ও বাড়ছে।

উপকূলে পানির সংকট ও নারীদের ভোগান্তি

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানি পাওয়া দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সীমিত অবকাঠামোর কারণে নারীদের প্রায়ই দূর থেকে পানি আনতে হয়। গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলের অনেক এলাকায় পানির উৎসে লবণাক্ততার মাত্রা জাতীয় মানের চেয়ে বেশি, এবং টিউবওয়েল ও পুকুরের পানিতে ধাতব পদার্থ পাওয়া গেছে। এক গবেষণা অনুযায়ী, বছরে গড়ে ৪.৬৫ মাস পর্যন্ত নিরাপদ পানি পাওয়া যায় না, এবং কিছু এলাকায় সংকট সাত মাসের বেশি স্থায়ী হয়। প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারী ও কিশোরীদের ওপর পড়ে, যা শারীরিক শ্রম, সময়ের অপচয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ও সমাধানের উদ্যোগ

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা পূর্ণিমা রানী দে (৪৫) এর জন্য নিরাপদ পানি সংগ্রহ দৈনন্দিন কষ্টের অংশ ছিল। প্রতিদিন তাঁকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে যেতে হতো, এবং অসুস্থ হলে পুকুরের অনিরাপদ পানি পান করতে বাধ্য হতেন। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব নারী নিরাপদ পানীয় পানি সংগ্রহের জন্য এক কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করেন, তাঁদের মধ্যে নারীস্বাস্থ্যজনিত সমস্যার হার ৯৩.৩%। তবে জিসিএ প্রকল্পের সহায়তায় তাঁর বাড়িতেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। এখন বাড়িতে নিরাপদ পানি আছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি কম এবং সময় বাঁচছে। পূর্ণিমা বলেন, "আগে পানি আনতে ২ কিলোমিটার হাঁটতে হতো, এখন নিজের বাড়িতেই নিরাপদ পানি পাই। মনে হয় জীবনের বড় কষ্ট কমে গেছে।"

প্রকল্পের বিস্তার ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি

জিসিএ প্রকল্প ৬৫৮টি পাড়াভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং ১,০২০টি নারী জীবিকায়ন দল গড়ে তুলেছে। প্রকল্পের মাধ্যমে আট ধরনের জীবিকায়ন পদ্ধতির আওতায় ২,৬৭২টি জলবায়ু সহনশীল জীবিকার উপকরণ প্যাকেজ বিতরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ
  • হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে কৃষি
  • কাঁকড়া ও তিল চাষ
  • নার্সারি, মাছ ও কাঁকড়ার খাদ্য উৎপাদন
  • অ্যাকুয়াজিওপনিক পদ্ধতিতে সমন্বিত মাছ ও সবজি চাষ

খুলনার কয়রা উপজেলার মাকসুদা খাতুন (৩১) জিসিএ প্রকল্পে যুক্ত হয়ে "গোলাপ" নামে ২৬ সদস্যের নারী জীবিকায়ন দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষ শিখেছেন, যা লবণাক্ত এলাকার জন্য উপযোগী। মাকসুদা বলেন, "নিরাপদ পানি ও প্রশিক্ষণ আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। আমাদের মতো নারীর জীবনে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।" ২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে জিসিএ প্রকল্পটি লোকাল অ্যাডাপটেশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, যা একটি বৈশ্বিক সম্মান।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে এবং এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের বাস্তবায়নে এই প্রকল্প উপকূলীয় নারীদের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি এনেছে। নিরাপদ পানি, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীরা এখন স্বনির্ভর ও শক্তিশালী হচ্ছেন, যা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে কাজ করছে।