অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর: ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে শুরু হওয়া এক বৈজ্ঞানিক রহস্য
অ্যান্টার্কটিকা বললেই চোখে ভেসে ওঠে সাদা বরফের বিশাল রাজ্য, কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর পেঙ্গুইনের দল। আমেরিকার চেয়ে প্রায় চার গুণ বড় এই মহাদেশটি মাইলের পর মাইল পুরু বরফে ঢাকা। কিন্তু জানেন কি, অ্যান্টার্কটিকা সব সময় এমন বরফে ঢাকা ছিল না? একসময় এখানেও সবুজের সমারোহ ছিল, উত্তর কানাডার মতো তুন্দ্রা অঞ্চল ও পাইন গাছের জঙ্গল দেখা যেত। তাহলে কবে থেকে এই পরিবর্তন শুরু হলো? চলুন, আজ আমরা এই বরফরাজ্যের পেছনের দারুণ বৈজ্ঞানিক রহস্য জেনে নিই।
বরফের চাদর তৈরির সঠিক সময়
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির জীবাশ্ম-জলবায়ুবিদ এরিক উলফের মতে, ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসাবে অ্যান্টার্কটিকায় বরফের চাদর খুব বেশি দিন আগে তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ বিজ্ঞানীই একমত হবেন যে আজ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকায় প্রথমবারের মতো বরফের চাদর তৈরি হতে শুরু করে।’ এর আগে অ্যান্টার্কটিকা ছিল উষ্ণ ও সবুজ, আজকের উত্তর কানাডার মতো পরিবেশে ভরা।
তাপমাত্রা কমার পেছনের কারণ
আজ থেকে প্রায় ৫ কোটি বছর আগে পৃথিবী আজকের চেয়ে প্রায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম ছিল। কিন্তু পরের ১ কোটি ৬০ লাখ বছর ধরে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে এটি আজকের চেয়ে মাত্র ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ কাজ করেছে:
- কার্বন ডাই-অক্সাইড কমে যাওয়া: ৬ থেকে ৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল প্রতি ১০ লাখে এক হাজার থেকে দুই হাজার ভাগ, যা আজকের তুলনায় আড়াই থেকে পাঁচ গুণ বেশি। এই গ্যাস কমে যাওয়ায় পৃথিবী ঠান্ডা হতে শুরু করে এবং বরফ জমার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়।
- মহাদেশের ভাঙাগড়া: টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে দক্ষিণ আমেরিকা ও অ্যান্টার্কটিকা আলাদা হয়ে যায়, তাদের মাঝে তৈরি হয় ড্রেক প্যাসেজ নামের সমুদ্রপথ। এর ফলে অ্যান্টার্কটিকার চারপাশে সার্কামপোলার কারেন্ট নামের স্রোত তৈরি হয়, যা মহাদেশটিকে গরম পানির স্রোত থেকে আলাদা করে ফেলে এবং এটি একটি বিশাল আইসবক্সে পরিণত হয়।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে জানলেন?
বিজ্ঞানীরা এই তথ্য পেয়েছেন সমুদ্রের তলদেশের ছোট প্রাণীদের খোলস থেকে। অক্সিজেনের দুটি রূপ—অক্সিজেন-১৬ ও অক্সিজেন-১৮—এর মধ্যে ভারী অক্সিজেন-১৮ বরফ জমার সময় সাগরের পানিতে বেড়ে যায়। প্রাণীরা তাদের খোলস বানানোর সময় এই ভারী অক্সিজেন শোষণ করে। ৩ কোটি ৪০ লাখ বছর আগের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেই সময় খোলসে ভারী অক্সিজেনের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল, যা বরফ জমার প্রমাণ দেয়।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
অ্যান্টার্কটিকার বরফ আবার গলে যাওয়া সম্ভব, কারণ পৃথিবী আগেও এমন পরিবর্তন দেখেছে। তবে মানুষের কারণে দ্রুত গলনের আশঙ্কা কম হলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের সচেতন হতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলে এই সুন্দর বরফরাজ্য রক্ষা করা যেতে পারে।



