ডুমসডে ভল্টে নতুন বীজ সংযোজন: বিশ্বের কৃষি ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই
আর্কটিক সাগরের নির্জন দ্বীপ সভালবার্ডে অবস্থিত ডুমসডে ভল্ট, যা বিশ্বের কৃষি ঐতিহ্য রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এই বাংকারটি নরওয়ের স্পিটসবেরগেনে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত, যেখানে বরফ ও চিরহিমায়িত মাটির স্তরে বীজগুলো সংরক্ষিত হয়। ভবিষ্যতে যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পৃথিবীর কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস হলে, এখানকার বীজগুলো দিয়ে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করা সম্ভব হবে।
নতুন বীজ সংযোজন ও মাইলফলক
গতকাল বুধবার এই ভল্টে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৭ হাজার ৮০০ নতুন বীজের নমুনা জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকার প্রধান দানাদার শস্য, স্পেনের জলপাই এবং গুয়াতেমালার প্রাচীন ফসলের বীজ। এই নতুন জমার ফলে ভল্টে সংরক্ষিত মোট বীজের নমুনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৮৬ হাজার ১০২টি, যা একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
প্রাকৃতিক ফ্রিজার হিসেবে ভল্টের কার্যকারিতা
ডুমসডে ভল্ট প্রাকৃতিক ফ্রিজার হিসেবে কাজ করে, যেখানে বীজগুলো মাটির ১০০ মিটারেরও বেশি গভীরে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়। বাংকারটি পাহাড়ের এমন স্তরে অবস্থিত যেখানে চিরহিমায়িত মাটি বিদ্যমান, ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলেও বীজগুলো প্রাকৃতিকভাবেই জমে থাকে এবং নষ্ট হয় না। এছাড়া, এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় বরফ গলে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়লেও বন্যার ঝুঁকি নেই।
প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এবারের সংগ্রহে গুয়াতেমালা এবং নাইজার প্রথমবারের মতো তাদের বীজ জমা দিয়েছে। গুয়াতেমালা টিওসিনটে নামক বন্য ঘাসের বীজ জমা দিয়েছে, যা বর্তমান ভুট্টার পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত। নাইজার ২০৪টি প্রজাতির শস্য জমা দিয়েছে, যার মধ্যে সোরঘাম, কাউপিয়া এবং বাজরা অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব কর্ডোবা থেকে ৫০টি প্রধান জাতের চাষযোগ্য ও বন্য জলপাইয়ের বীজ পাঠানো হয়েছে, প্রথাগত জলপাইবাগান বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য।
বিশ্বব্যাপী জিনব্যাংক ও সহযোগিতা
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নিজস্ব জিনব্যাংক বা বীজ সংগ্রহশালা রয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ বা অর্থাভাবের কারণে সেগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ক্রপ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক স্টিফান শ্মিৎজের মতে, সভালবার্ডে বীজের ব্যাকআপ রাখা কৃষির ভিত্তি রক্ষায় বিশ্বের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। এখানে বীজগুলো ব্ল্যাক-বক্স শর্তে রাখা হয়, অর্থাৎ মালিকানা কেবল জমাদানকারী দেশের থাকে এবং একমাত্র তারাই প্রয়োজনে বীজ তুলতে পারে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ নরওয়ে সরকার, ক্রপ ট্রাস্ট এবং নর্ডজেনের যৌথ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
ডুমসডে ভল্ট এখন ১৩ হাজার বছরের কৃষি ইতিহাসকে নিজের বুকে আগলে রেখেছে, পৃথিবীর এক অন্ধকার ভবিষ্যতের বিমা হিসেবে। এই উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী কৃষি বৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক হবে।
