চট্টগ্রামে লবণাক্ত পানির সংকট: নগরবাসীর দৈনন্দিন যন্ত্রণা
বিগত কয়েক বছর ধরে লবণাক্ততার তীব্র সমস্যার মুখোমুখি হইতেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। প্রতিষ্ঠানটি হালদা ও কর্ণফুলী নদী হইতে পানি সংগ্রহ করিয়া পরিশোধনের মাধ্যমে নগরে সরবরাহ করিতেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রের পানি নদীতে প্রবেশ করায় ওয়াসার পানিতে লবণের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাইতেছে। এই অবস্থায় পানির উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা দিনের পর দিন পানি পাইতেছে না। যেই সামান্য পরিমাণ পানি পাওয়া যাইতেছে, তাহাও লবণাক্ততার কারণে ব্যবহারের অযোগ্য হইয়া পড়িতেছে।
কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর হ্রাস: সংকটের মূল কারণ
চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সংগ্রহের একমাত্র ভরসা কাপ্তাই হ্রদ। এই হ্রদ হইতে পানি আসিয়া প্রথমে কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে পড়ে। তবে সমস্যা হইল, স্বাভাবিক অবস্থায় হ্রদে পানির স্তর ১০৯ ফুট পর্যন্ত থাকিলেও সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে তাহা ক্রমশ নামিয়া যাইতেছে। বিশেষ করিয়া গ্রীষ্মের শুরুতে হ্রদের বিভিন্ন অংশে পানির পরিমাণ কমিয়া যায়। ইহার ফলে নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, মৎস্য উৎপাদন ও পর্যটন খাতে ক্ষতির পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন হ্রাস পায় এবং ওয়াসার পানির সংকট তীব্র হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসকদের সতর্কতা
পানিতে অতিরিক্ত লবণের কারণে নগরবাসীর স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়িতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, খাওয়ার পানিতে সর্বোচ্চ ১৪৫ মিলিগ্রাম সোডিয়াম বা লবণ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরিয়া ইহার অধিক পরিমাণে সোডিয়ামযুক্ত পানি পান ও ব্যবহার করিলে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও চোখের ক্ষতি হইতে পারে। বিশেষ করিয়া উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা এই সংকটে বেকায়দায় পড়িয়া যাইবেন।
ওয়াসার উদ্যোগ: নতুন শোধনাগার ও বিকল্প প্রকল্প
এই সংকট মোকাবিলায় চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ একটি নূতন পানি শোধনাগার প্রকল্প নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করিয়াছে। ‘লবণাক্ততা পরিহারের লক্ষ্যে মোহরা পানি শোধনাগারের ইনটেক স্থানান্তর এবং উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ' নামক এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হইলে দৈনিক ৬৩ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করা সম্ভব হইবে। শুষ্ক মৌসুমের সংকট কাটাইতে এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার নিরিখে ইহা একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।
ওয়াসার কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীতে পানির দৈনিক চাহিদা ৫৮ কোটি লিটার, যাহা ২০৩২ সালে ৭৫ কোটি এবং ২০৪২ সালে ১০০ কোটি লিটার ছাড়াইয়া যাইবে। এই বিশাল চাহিদা মিটাইতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ লওয়া হইবে বলিয়া জানাইয়াছে ওয়াসা।
বাস্তবায়নে বিলম্ব ও জনগণের অভিযোগ
যদিও ২০২৯ সালে প্রকল্প শেষ করিবার লক্ষ্য ছিল, কিন্তু এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরুই করা যায় নাই। বিপদ বুঝিয়াও আগাম ব্যবস্থা গ্রহণে এই অনীহা কেন—এই প্রশ্ন উঠিতেছে। প্রায় প্রতি বৎসরই লবণাক্ততার জন্য সীমাহীন ভোগান্তি পোহাইতে হইলেও কর্তৃপক্ষ স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটিতেছে না বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টি কম হওয়া এবং পলি জমিয়া কাপ্তাই হ্রদ ভরাট হওয়ার মতো সমস্যাগুলি আমলে লইয়া বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা অতি জরুরি। চট্টগ্রামের ন্যায় একটি বৃহৎ নগরের বাসিন্দাদের প্রয়োজনের কথা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভাবিয়া দেখা উচিত।
সমাধানের পথ: ত্বরিত বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
লবণাক্ততার সমস্যা দ্রুত সমাধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জোয়ারের পানি আটকাইবার জন্য রেগুলেটর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলিতেছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন প্রয়োজন কেবল এই সকল উদ্যোগের সফল ও ত্বরিত বাস্তবায়ন। আমরা কামনা করি, এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কাপ্তাই হ্রদকে বাঁচানোর ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।
