৫ হাজার বছরের পুরোনো হিমবাহে প্রাণঘাতী সুপারবাগ, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী
হিমবাহে প্রাগৈতিহাসিক সুপারবাগ, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর

হিমবাহের গভীরে প্রাণঘাতী সুপারবাগের সন্ধান, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর

প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো হিমবাহের গভীরে জমে থাকা বরফের স্তরে প্রাগৈতিহাসিক এক প্রাণঘাতী জীবাণু খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রাচীন জীবাণুটি বর্তমান সময়ের অন্তত ১০টি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবাণুর পুনরুজ্জীবন

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ ও পারমাফ্রস্ট বা চিরতুষার দ্রুত গলতে শুরু করায় এ ধরনের সুপ্ত জীবাণু আবার প্রকৃতিতে ফিরে আসছে। হাজার হাজার বছর ধরে বরফের নিচে বন্দী থাকা অজানা সব রোগজীবাণু পুনরায় জেগে উঠে বিশ্বজুড়ে নতুন কোনো মহামারির সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিক–প্রতিরোধী ক্ষমতার চমকপ্রদ দিক

এ গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ভীতিকর দিক হলো এই অণুজীবের অ্যান্টিবায়োটিক–প্রতিরোধী ক্ষমতা। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখেছেন, পাঁচ হাজার বছর আগে যখন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের অস্তিত্বই ছিল না, তখনো এই জীবাণুর মধ্যে এমন কিছু জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ছিল, যা আধুনিক ১০টি ভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিককে অকেজো করে দিতে পারে।

আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে জীবাণুরা প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলে। কিন্তু এই প্রাগৈতিহাসিক অণুজীবটি প্রমাণ করছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স একটি অত্যন্ত প্রাচীন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হতে পারে। এর আগে বিজ্ঞানীরা সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্টে প্রায় ৪০ হাজার বছর ধরে জমে থাকা অণুজীবকে পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক সম্ভাবনা

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো বরফে জীবাণু পুরোপুরি সুপ্ত অবস্থায় ছিল। বর্তমানের উষ্ণ আবহাওয়ায় হিমবাহ গলতে থাকায় এ ধরনের অণুজীব জেগে উঠছে। এসব নদী বা বাতাসের মাধ্যমে মানববসতির কাছাকাছি পৌঁছানোর সক্ষমতাও রয়েছে।

এই সুপারবাগের জেনেটিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। যদি অণুজীবটি সাধারণ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে বর্তমানের প্রচলিত অনেক ওষুধই একে দমনে ব্যর্থ হবে। এটি বিশেষ করে সেই রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে, যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম।

জলবায়ু পরিবর্তনের বায়োলজিক্যাল টাইম বোমা

জলবায়ুবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, উত্তর মেরু ও হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়া মানে কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নয়; বরফ গলে পৃথিবীর জন্য এক অজানা বায়োলজিক্যাল টাইম বোমা নিয়ে আসছে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের গবেষক দল এই সুপারবাগের ডিএনএ সিকোয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উন্মোচনে কাজ করছে।

এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে, যেখানে প্রাচীন জীবাণুগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়া বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়, বরং মানব স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।