উপকূলে সুপেয় পানির সংকট মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত
উপকূলে সুপেয় পানির সংকট মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত

আমাদের উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার সবচেয়ে বড় ও প্রধান সমস্যা হলো সুপেয় বা খাওয়ার পানির তীব্র সংকট। চারদিকে নদী, খাল, জলাভূমি ও বিস্তীর্ণ জলরাশি থাকলেও পানের উপযোগী বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষের হাহাকার ক্রমেই তীব্রতর হয়ে উঠছে। লবণাক্ততার কারণে তা পান করার অনুপযুক্ত হওয়ায় উপকূলের অধিকাংশ বাসিন্দাই সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। পত্রিকান্তরে জানা যায়, এই ধরনের ভোগান্তির শিকার উপকূলের ৭৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ, দেড় কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। কেবল বাগেরহাটের মোংলা উপজেলারই ৬৫ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থাই নেই।

সংকটের কারণ

জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ব্যাঘাত, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ এবং ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠস্থ পানির উৎস আজ মারাত্মকভাবে দূষিত ও লবণাক্ত হয়ে পড়ার ফলে সুপেয় পানির সংকট এখন আর কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ নারীদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পানির সন্ধানে যেতে হয়। কোথাও কোথাও একটিমাত্র টিউবওয়েল কিংবা পুকুরের পানির উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে শত শত পরিবার। অনেকে বাধ্য হন দূষিত পানি পান করতে; ফলে তাদের স্বাস্থ্যগত বিষয়টিও আমলে নিতে হবে।

ব্যর্থতা ও উদাসীনতা

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীকাল অতিক্রম করে আসার পরেও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ পানির জন্য এই রকম সংগ্রাম করতে হচ্ছে—এটি নিঃসন্দেহে আমাদের ব্যর্থতার পরিচায়ক। দুঃখজনক হলেও সত্য, উপকূলের এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে বরাবরই। নানা প্রকল্প, প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে অধিকাংশ উদ্যোগই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে কাগজে কলমে। কতিপয় ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প, পুকুর পুনঃখনন কিংবা পানি শোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে, তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও অকার্যকর।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত

অথচ উন্নত বিশ্বে আমরা কী দেখি? মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ, বিশেষত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করার জন্য আধুনিক ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। সিঙ্গাপুর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য পানি পুনঃশোধন এবং উন্নত জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানিসংকট মোকাবিলায় বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নেদারল্যান্ডস জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসাবে গড়ে তুলেছে টেকসই পানি অবকাঠামো। উন্নত বিশ্ব বুঝেছে—ভবিষ্যতের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হবে পানি। অর্থাৎ, অন্যান্য দেশ যেখানে সুপেয় পানির সংকটকে ভবিষ্যতের অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তাঝুঁকি হিসাবে বিবেচনা করছে, সেখানে আমরা বছরের পর বছর বিষয়টিকে অবহেলা করে যাচ্ছি—এর ফল কি সুখকর হওয়ার কথা?

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

সুপেয় পানি আজ শুধু মানবজীবনের মৌলিক প্রয়োজন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশের পরিবেশগত বাস্তবতা এমনিতেই উদ্বেগজনক। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, নদনদী মরে যাচ্ছে, হুহু করে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। অথচ পরিতাপের বিষয়, এমন একটি বড় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা নেই প্রত্যাশা অনুযায়ী। উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক পানি শোধনাগার স্থাপন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং লবণাক্ততার বিস্তার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নে আমাদের অগ্রগতি কতটুকু? এখন অবধি আমরা স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই পুকুর সংরক্ষণ ও পুনঃখনন কার্যক্রমই জোরদার করতে পারলাম না—এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?

উপসংহার

ভুলে গেলে চলবে না, সুপেয় পানি কেবল উন্নয়ন বা অবকাঠামোর প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। উপকূলের মানুষকে অবহেলার অন্ধকারে রেখে টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কেবল কঠিনই নয়, অনেকটা অসম্ভব। অতএব, সুপেয় পানিকে সত্বর জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের এই ক্ষমাহীন উদাসীনতার মূল্য যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে না হয়, সেই কথা চিন্তা করে আমাদের নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে।