সমুদ্র আর নদীর মাঝে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়ার জীবনসংগ্রাম
সমুদ্র আর নদীর মাঝে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়া

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়ার এক পাশে মাতামুহুরী নদী, অন্যপাশে সাগর। মূল ভূখণ্ডে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। এই ছোট্ট ভূখণ্ডে বসবাস করছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ। তাদের জীবন প্রতিদিনের লড়াইয়ে কাটে সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সেতু ও নিরাপদ যোগাযোগের অভাবে। সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস।

উন্নয়নের ছোঁয়া নেই

দ্বীপ থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাতে তার আলোকচ্ছটা দেখা যায়, কিন্তু সেই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি করিয়ারদিয়ার মানুষের জীবনে। দ্বীপে যাওয়ার জন্য কোনো সেতু নেই। প্রধান সড়কটি মাত্র আট ফুট চওড়া, যার কিছু অংশে ইট বিছানো, কিছু অংশে ইট উঠে গেছে, বাকি অংশ কাঁচা। পুরো দ্বীপে মাত্র তিনটি ইজিবাইক রয়েছে, যা বেহাল সড়কে সব জায়গায় যেতে পারে না। জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে নৌকা ও পায়ে হাঁটার ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্বাস্থ্যসেবার অভাব

এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। কেউ অসুস্থ হলে ডিঙি নৌকায় করে মূল ভূখণ্ডে যেতে হয়। রাতের বেলা বা খারাপ আবহাওয়ায় রোগী পারাপার প্রায় অসম্ভব। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এটি বড় ঝুঁকি। পানিবাহিত নানা রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রসূতিরা চরম ভোগান্তি পোহান। অনেক প্রসূতি নির্ধারিত সময়ের আগেই মূল ভূখণ্ডে গিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২৩ জানুয়ারি রাতে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিমের স্ত্রী শাহীনা আকতারের (৩২) প্রসব বেদনা ওঠে। নৌকা না পাওয়ায় এবং ভাঙা সড়কে প্রসূতিকে নিতে না পারায় রাতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরদিন সকালে ডিঙিতে নদী পেরিয়ে পেকুয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে নবজাতককে বাঁচানো যায়নি। মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় খুব কষ্ট পেতে হয়। এক দিন পর হাসপাতালে নেওয়ার কারণে জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং নবজাতক মারা যায়। এভাবে আমরা আমাদের সন্তান বা স্ত্রী হারাচ্ছি।’

পানির সংকট

দ্বীপে বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট। শুষ্ক মৌসুমে বেশির ভাগ নলকূপে পানি ওঠে না। যেগুলোতে পানি পাওয়া যায়, তা লবণাক্ত। অনেকে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন। কেউ কেউ দূর থেকে পানি সংগ্রহ করেন, ফলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। স্থানীয় গুদামপাড়ার বাসিন্দা সৈয়দা খাতুন (৪৫) বলেন, নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। দুর্যোগের সময় সেই সংকট আরও তীব্র হয়।

বেহাল আশ্রয়কেন্দ্র

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনো তাড়া করে। সেদিন এই দ্বীপে প্রাণ হারিয়েছিল দুই শতাধিক মানুষ। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও নিরাপত্তার চিত্র বদলায়নি। পুরো দ্বীপের জন্য একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক হামিদ হোছাইন জানান, ১৯৯৪ সালে সৌদি অর্থায়নে বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি নির্মিত হয়। লবণাক্ততার কারণে ভবনের বেশ কিছু অংশ খসে পড়েছে। ২০২৩ সালে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনের পর ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। বর্তমানে ১১৫ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।

বিদ্যালয়ের দেয়াল, বিম ও বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল। ছাদের কিছু অংশে পলেস্তারা খসে পড়ছে। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি ভেঙে গেছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক ও অভিভাবকদের আশঙ্কা, বড় ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড় হলে ভবনটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। বর্ষা মৌসুম বা নিম্নচাপের খবর এলেই আতঙ্ক বাড়ে, কারণ এই একটি ভবনেই আশ্রয় নিতে হয় পুরো দ্বীপের মানুষকে। দুর্যোগের সময় নারী, শিশু, বৃদ্ধ মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষ গাদাগাদি করে অবস্থান নেন। পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। গবাদিপশুর জন্য দ্বিতীয় তলায় র‍্যাম্প না থাকায় গরু-ছাগল নিচতলায় বেঁধে রাখতে হয়, ফলে জলোচ্ছ্বাসে পশুসম্পদ রক্ষা কঠিন।

ষাটোর্ধ্ব কালু মিয়া ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের স্মরণ করে বলেন, সেদিন আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় দুই শতাধিক মানুষ মারা গেছে। বেশির ভাগ পরিবার নৌকায় আশ্রয় নিয়েছিল, ঝোড়ো হাওয়ায় নৌকা ডুবে প্রাণ হারায়। পরে একটি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হলেও এখন তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

পেকুয়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ বোস বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবনে আর শ্রেণি কার্যক্রম চালবে না। অল্প কিছুদিনের মধ্যে নিচে একটি শেড তৈরি করে সেখানে ক্লাস করাব। ইতিমধ্যে সাত লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বহুতল ভবন নির্মাণে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে কাজ চলছে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শরীফ বলেন, ‘দ্বীপের একটিমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র কাম বিদ্যালয় এত ঝুঁকিপূর্ণ, সেটি জানতাম না। দ্রুত সময়ের মধ্যে কীভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায়, সেটি দেখছি।’

বাড়ছে জোয়ার ও লবণাক্ততা

বর্ষা মৌসুমে করিয়ারদিয়ায় বেড়িবাঁধে ভাঙন বাড়ছে। অল্প বৃষ্টিতেই নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। স্থানীয়রা বলছেন, আগের চেয়ে জোয়ারের উচ্চতা বাড়ছে। জোয়ারের পানি ঢুকে লবণাক্ততা বেড়েছে, ফলে কৃষি উৎপাদন কমে গেছে। একসময় অধিকাংশ মানুষ ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেখানে বেড়েছে লবণ চাষ ও মাছের ঘের। কৃষকেরা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন, যা পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট করছে। স্থানীয় ষাইটপাড়ার কৃষক আবু তাহের (৫৫) বলেন, ‘আগে জমিতে ভালো ধান হতো। এখন লবণপানি ঢুকে ফসল নষ্ট হয়। অনেকে ধানের জমি শুষ্ক মৌসুমে লবণের মাঠ ও বর্ষায় মাছের ঘের করছেন।’

দুর্বল দুর্যোগ প্রস্তুতি

দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও করিয়ারদিয়ায় সেই ব্যবস্থা দুর্বল। মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায়ই অকার্যকর হয়। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা সবার কাছে দ্রুত পৌঁছায় না। অনেক পরিবার মাইকিং বা লোকমুখে খবর পেয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যায়। দ্বীপে কোনো ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র বা দুর্যোগ প্রস্তুতিবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগের আগে সরকারি কর্মকর্তাদের তৎপরতা কম দেখা যায়। ফলে মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়িঘর ছাড়তে চায় না।

জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, ‘উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। ফলে মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। করিয়ারদিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’