জলবায়ু পরিবর্তনের অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
জলবায়ু পরিবর্তনের অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা ও মোকাবিলার উপায় অনুসন্ধান শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি যেমন মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষা ব্যাহত হওয়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ জরুরি।

অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিতকরণ ও পরিমাপ

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশে এটি কম আলোচিত। ২০২৪ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিভিন্ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তি ও মানদণ্ড নির্ধারণে আরও কাজ প্রয়োজন। তিনি ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি অন ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ম্যানেজমেন্টকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশুরা, কিন্তু তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেই। দক্ষিণাঞ্চলের শিশুরা কাজের জন্য ইটভাটায় যায়, ফলে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েরা স্কুলে ফিরতে পারে না, যা দূর করতে ব্রিং ব্যাক গার্লস স্টুডেন্ট জাতীয় কর্মসূচি প্রয়োজন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নারী ও কন্যাশিশুর ওপর প্রভাব

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব নারী ও কন্যাশিশুর ওপর। প্রায় ৯০ শতাংশ নারী নিজেদের দুর্ভোগের কথা বললেও তাদের অবদান অস্বীকৃত। পানির সংকটে শিশুরা প্রতিদিন দুই-তিন ঘণ্টা পানি সংগ্রহে ব্যয় করে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সাতক্ষীরা ও খুলনায় ৭৭ শতাংশ মানুষ মানসিক চাপে ভুগছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্রিশ্চিয়ান এইডের নুজহাত জাবিন বলেন, অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ কঠিন এবং বিষয়ভিত্তিক। একটি সাধারণ বোঝাপড়া ও সংজ্ঞা তৈরি প্রয়োজন, যেখানে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিদরা ভূমিকা রাখতে পারেন। তথ্য সংগ্রহ ও নীতিনির্ধারণে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

এসডিএসের নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম কল্পনা বলেন, অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্যমান নির্ধারণ জরুরি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিলকে কার্যকর করে আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত করা দরকার। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়, ফলে সামাজিক অবজ্ঞা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।

এসডিএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী মজিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ সবসময় উপেক্ষিত। সরকারি সেবায় বৈষম্য রয়েছে। নদীভাঙন তীব্রতর হয়েছে, কিন্তু সহায়তায় ঘাটতি রয়েছে। দারিদ্র্য ম্যাপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও নীতিগত সংস্কার

সিপিআরডির চিফ এক্সিকিউটিভ মো. শামসুদ্দোহা বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা ও সামাজিক ক্ষতি বিবেচনা করতে হবে। নীতি কাঠামো বিচ্ছিন্ন, ফলে গবেষণার ফলাফল নীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি জরুরি।

ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের শামছুজ্জামান বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষকে রোহিঙ্গা বলে অভিহিত করা সামাজিক অবমূল্যায়ন। পাঠ্যক্রমে অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত করে বোঝাপড়া বাড়ানো প্রয়োজন।

তথ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয়করণ

আইসিসিসিএডির ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিব হক বলেন, তথ্য ব্যবস্থাপনায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের বিশ্লেষণ নেই। সমন্বিত ও ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োজন।

স্টার্ট নেটওয়ার্কের সাজিদ রায়হান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই স্থানীয় কর্মসূচি কাঠামো প্রয়োজন। আগে থেকেই ক্ষয়ক্ষতির পূর্বানুমান করে পরিকল্পনা করা উচিত।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তি

কেয়ারের মৃত্যুঞ্জয় দাস বলেন, অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিকে আর্থিক মূল্যে পরিমাপ করা দরকার। ডেলটা প্ল্যান ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে লস অ্যান্ড ড্যামেজ যুক্ত করা জরুরি।

হেলভেটাসের ফারহানা আফরোজ বলেন, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্থিতির মতো বিষয় টাকায় মাপা যায় না। স্থানীয় প্রকল্পে তথ্যের ধারাবাহিকতা নেই, যা নথিভুক্তকরণকে কঠিন করে।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা

শরীয়তপুরের নদীভাঙনে স্থানচ্যুত বিলকিস আক্তার বলেন, আট বছরে নদী তার বসত ঘর তিনবার নিয়ে গেছে। মেয়েকে ১৬ বছর বয়সে বিয়ে দিতে হয়েছে। সমাজে নদীভাঙা বলে ডাকা হয়, কোনো অনুষ্ঠানে ডাকা হয় না।

মোহাম্মাদ আবদুল বারেক বলেন, তিন-চারবার ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। শক্ত বেড়িবাঁধ ও স্থায়ী পুনর্বাসন প্রয়োজন।

সুপারিশ

  • অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি জাতীয় নথিভুক্তকরণ ও নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করা
  • দুর্যোগ, জলবায়ু ও সামাজিক খাতের মধ্যে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করা
  • ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
  • শিশু, নারী ও কন্যাশিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখতে বিশেষ কর্মসূচি ও শিক্ষাবৃত্তি
  • গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণকে নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করা
  • নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করা

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন মো. জিয়াউল হক, গওহর নঈম ওয়ারা, কবিতা বোস, নুজহাত জাবিন, রাবেয়া বেগম কল্পনা, মজিবুর রহমান, মো. শামসুদ্দোহা, শামছুজ্জামান, সাকিব হক, সাজিদ রায়হান, মৃত্যুঞ্জয় দাস, ফারহানা আফরোজ, বিলকিস আক্তার, মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান, আবদুর রাজ্জাক, পাভেল পার্থ, মোহাম্মাদ আবদুল বারেক ও হুমায়েরা আক্তার। সঞ্চালনা করেন ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।