বিশ্ব আবহাওয়ায় আবারও আলোচনায় এসেছে ‘এল নিনো’। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরের এই প্রাকৃতিক ঘটনা সক্রিয় হলে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের ধরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ফলে ‘এল নিনো আসছে’—এই খবর সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করেছে।
কীভাবে কাজ করে এল নিনো
এল নিনো এমন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এটি বৃহত্তর জলবায়ুগত একটি চক্রের অংশ, যাকে এল নিনো–দক্ষিণী দোলন বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল একসঙ্গে কাজ করে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে।
স্বাভাবিক সময়ে বায়ুপ্রবাহ উষ্ণ পানি পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে বা দিক পরিবর্তন করে। ফলে উষ্ণ পানি পূর্বদিকে জমা হতে থাকে এবং সেখান থেকেই আবহাওয়ার বড় পরিবর্তন শুরু হয়।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব
এল নিনো সক্রিয় হলে এক অঞ্চলের আবহাওয়া অন্য অঞ্চলের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক এলাকায় বৃষ্টি কমে গিয়ে খরার ঝুঁকি বাড়ে। উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে শীত তুলনামূলক মৃদু হয়ে যায়। অর্থাৎ, এটি কোনও একটি দেশের সমস্যা নয়—বরং বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরণই বদলে দেয়।
তাপমাত্রা বাড়ার কারণ
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়লে সেই অতিরিক্ত তাপ ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে তাপমাত্রা এমনিতেই বাড়ছে। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হতে পারে।
বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশ প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে না থাকলেও বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এর প্রভাব এ দেশেও পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর সময় দেশে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হতে পারে। কখনও খরার প্রবণতা দেখা দিতে পারে, আবার কখনও অস্বাভাবিক বা অতিবৃষ্টিও হতে পারে। এতে কৃষি, পানি ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সব এল নিনো এক রকম নয়
প্রতিটি এল নিনোর তীব্রতা এক নয়। কখনও এটি দুর্বল থাকে, আবার কখনও শক্তিশালী হয়ে বড় ধরনের বৈশ্বিক প্রভাব ফেলে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি বুঝে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কীভাবে আগাম জানা যায়
সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ ও উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এল নিনোর সম্ভাবনা নির্ধারণ করেন। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলো নিয়মিত এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করে আগাম সতর্কবার্তা দেয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
এল নিনোর প্রভাব শুধু আবহাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, পানির প্রাপ্যতা ও অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আগে থেকেই ধারণা থাকলে ক্ষতি কমানো এবং প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।
সর্বোপরি, এল নিনো প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক চক্র। তবে এর প্রভাব কখনও কখনও গভীর হতে পারে। তাই আতঙ্ক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক সচেতনতা ও প্রস্তুতিই সবচেয়ে জরুরি। দূরের সমুদ্রের পরিবর্তনও যে আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে—এল নিনো তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।



