১৯৯৪ সালের তুলনায় ২০২৬ বিশ্বকাপে গরমের ঝুঁকি দ্বিগুণ
১৯৯৪ সালের তুলনায় ২০২৬ বিশ্বকাপে গরমের ঝুঁকি দ্বিগুণ

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের তুলনায় ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় যত কাছে আসছে, গরম তত ধীরে ধীরে বাড়ছে। অনেক ফুটবল ভক্ত মাঠে গিয়ে খেলা দেখার পরিকল্পনা করছেন, তবে তাঁদের খেলা উপভোগ করার পাশাপাশি প্রচণ্ড গরম সহ্য করতে হবে।

ফিফার সতর্কবার্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

ফিফা জানিয়েছে, বিশ্বকাপের প্রতি চারটি ম্যাচের মধ্যে একটি ম্যাচ প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হতে পারে। তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ফিফার এই সতর্কবার্তার বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, গরমের ঝুঁকি আসলে আরও অনেক বেশি। কারণ, ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শেষবার ফুটবল বিশ্বকাপ হয়েছিল। এর পর থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। ফলে এখন চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশি।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিশ্লেষণ

জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর একটি নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তীব্র তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি মাঠে থাকা খেলোয়াড় ও গ্যালারিতে বসা দর্শক সবার স্বাস্থ্যের জন্যই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত গরমের উদ্বেগের কারণে ফিফা একটি নতুন নিয়ম করেছে। এখন থেকে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর প্রতি অর্ধে একটি করে কুলিং ব্রেক দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ম্যাচের সময় ও আয়োজক দেশ

এবারের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি স্টেডিয়ামে এই খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হবে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এবারের ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ২৬টি ম্যাচই প্রচণ্ড গরমে খেলা হতে পারে। এই ম্যাচগুলোর সময় ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার (ডব্লিউবিজিটি) সূচকে তাপমাত্রা অন্তত ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডব্লিউবিজিটি সূচকের গুরুত্ব

এই বিশেষ সূচকটি মূলত একটি পরিমাপ। এর মাধ্যমে বোঝা যায় তীব্র তাপ, আর্দ্রতা, সূর্যের আলো ও বাতাসের মধ্যে মানুষের শরীর নিজেকে কতটা ভালোভাবে ঠান্ডা রাখতে পারছে। ডব্লিউবিজিটি সূচকে তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে খেলোয়াড়দের শরীরে তাপজনিত নানা সমস্যা বা অসুস্থতার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। এই কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের ইউনিয়ন এই তাপমাত্রায় খেলা চলাকালীন খেলোয়াড়দের জন্য কুলিং ব্রেক নেওয়ার সুপারিশ করে।

শীতলীকরণ ব্যবস্থা ও ঝুঁকি

অবশ্য এবার গরমে পড়তে যাওয়া ২৬টি ম্যাচের মধ্যে ১৭টি ম্যাচই এমন স্টেডিয়ামে খেলা হবে যেখানে আধুনিক শীতলীকরণ বা এসি ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে খেলোয়াড় ও দর্শকদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। ডব্লিউডব্লিউএ–এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও ২১টি ম্যাচে এই একই রকম চরম তাপমাত্রার আশঙ্কা করা হয়েছিল। তবে আশঙ্কার কথা হলো, এবারের পাঁচটি ম্যাচ ডব্লিউবিজিটি সূচকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় খেলা হতে পারে।

ম্যাচ স্থগিতের সুপারিশ

অনেক সংস্থা জানিয়েছে, তাপমাত্রা এতটা বেড়ে গেলে খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তার স্বার্থে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ম্যাচগুলো পিছিয়ে দেওয়া বা স্থগিত করা উচিত। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের তুলনায় ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরমের এই ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ডব্লিউডব্লিউএ–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো এই বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, তীব্র গরমের এই পরিস্থিতি খেলোয়াড়দের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি মাঠে আসা দর্শকদের জন্যও চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

দর্শকদের ঝুঁকি

খেলা দেখতে আসা হাজার হাজার ভক্ত যখন স্টেডিয়ামের বাইরে বা খোলা জায়গায় জড়ো হন, তখন তাদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ, হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক দেখভালের জন্য সেখানে খেলোয়াড়দের মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার বা চিকিৎসা সুবিধা থাকে না। বিশ্বকাপের ১৬টি স্টেডিয়ামের মধ্যে মাত্র তিনটি স্টেডিয়ামে (ডালাস, হিউস্টন ও আটলান্টায়) সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা এসি ব্যবস্থা আছে।

ফাইনাল ম্যাচের সম্ভাব্য তাপমাত্রা

ডব্লিউডব্লিউএ–এর হিসাব অনুযায়ী, আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। সেই ফাইনালে ডব্লিউবিজিটি সূচকে তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর সম্ভাবনা প্রতি ৮ ভাগে ১ ভাগ। আর তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে প্রায় ২.৭ শতাংশ। অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বিশ্বের অন্যতম বড় একটি খেলাও যে তীব্র গরমের কারণে বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, তা ফিফা ও ফুটবল ভক্তদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।

জাতিসংঘের সমর্থন

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধান নির্বাহী সাইমন স্টিয়েলও এই সতর্কবার্তার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন। ফ্রিডেরিকে অটো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, ১৯৯৪ সালের তুলনায় এখন বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এই তীব্র গরম খেলোয়াড় ও দর্শক সবার জন্য বড় ঝুঁকি। আমরা যে খেলাটিকে ভালোবাসি ও যাঁরা এই খেলা দেখেন, তাঁদের সবাইকে রক্ষা করতে আমাদের আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এর জন্য আমাদের ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানি বাদ দিয়ে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।

ফিফার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

এদিকে বিশ্বকাপের সুরক্ষায় তারা কী কী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার একটি রূপরেখা দিয়েছে ফিফা। অন্যান্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফিফা জানিয়েছে, তারা খেলার সময় মাঠের আবহাওয়া ও তাপমাত্রা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে। এ জন্য তারা নিয়মিত ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার ও হিট ইনডেক্স পরীক্ষা করে দেখবে। খেলা চলাকালীন হঠাৎ চরম বা বিপজ্জনক আবহাওয়া তৈরি হলে, তা প্রতিরোধের জন্য আগে থেকে তৈরি রাখা জরুরি প্রোটোকল নিয়মগুলো তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করা হবে।