রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বৃহত্তর অংশজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র পানিসংকট বিরাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, কমে যাওয়া বৃষ্টিপাত, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এ পরিস্থিতি দিন দিন আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সরকারি ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে মানা হচ্ছে না বিধিনিষেধ।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত হ্রাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ দিয়েও পানি উঠছে না। পানি সংকটের কারণে কৃষি ব্যয় বাড়ছে, অনাবাদি হয়ে পড়ছে জমি এবং অনেক এলাকায় খাওয়ার পানির জন্যও মানুষকে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে হচ্ছে। প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি এই সংকটে ভুগছেন।
সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৬ নভেম্বর প্রকাশিত গেজেটে খাওয়ার পানি ছাড়া আগামী ১০ বছরের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়। পানি আইন-২০১৩ অনুযায়ী, সেচ বা শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নতুন নলকূপ স্থাপনেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে সেই নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না। আবাসিক বিদ্যুৎসংযোগ ব্যবহার করে অনেকেই সাবমারসিবল পাম্পের মাধ্যমে ধানখেতে সেচ দিচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও অবৈধভাবে পানি উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। ওয়ারপোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫-৯০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর ছিল ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে। ১৯৯৪ সালে তা ৩৫ ফুটে, ২০০৪ সালে ৫১ ফুটে এবং ২০১৩ সালে ৬০ ফুটে নেমে যায়। বর্তমানে অনেক এলাকায় পানির স্তর ৮০ থেকে ৯০ ফুটের নিচে চলে গেছে। কোথাও কোথাও ১১৩ ফুটের বেশি খনন করেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু এলাকায় ২০০ ফুট নিচেও পানির স্তর মিলছে না।
গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালে পানির স্তর ছিল মাত্র ৩৯ ফুট নিচে। ২০১৬ সালে তা নেমে যায় ১১৮ ফুটে। বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে পাতলা পানির স্তর থাকলেও তা গভীর নলকূপে তোলা যাচ্ছে না। গবেষকদের তথ্যমতে, বরেন্দ্র অঞ্চল দেশের সবচেয়ে শুষ্ক ও উষ্ণ এলাকাগুলোর একটি। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। গত কয়েক দশকে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতও আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। বছরের দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীন থাকায় মাটির নিচে পানির পুনর্ভরণও কমে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিশেষ করে গত দুই দশকে বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত আরো কমে যেতে পারে, যা পানিসংকটকে আরো তীব্র করবে।
বিএমডিএর ভূমিকা ও উদ্যোগ
বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নির্দেশনায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ গভীর নলকূপের অনুমতি থাকলেও বর্তমানে বেসরকারিভাবে বসানো হয়েছে হাজার হাজার শ্যালো ও গভীর নলকূপ। ফলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন চলছে। এতে মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক এলাকায় পানির স্তর আর আগের অবস্থায় ফিরে আসছে না।
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, বিএমডিএ মাত্র ২৭ শতাংশ পানি তোলে। বাকি পানি ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্পে তোলা হচ্ছে। এগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি জানান, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিএমডিএ সেচকাজে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। খাল, পুকুর ও জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।



