পাকিস্তানে তীব্র দাবদাহে লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত
পাকিস্তানে তীব্র দাবদাহে লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত

পাকিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহে লাখ লাখ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ওপরে রয়েছে। দিনের বেলায় তাপমাত্রা প্রায়ই ৪৪ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাচ্ছে। ফলে তীব্র গরমে দুপুরের দিকে মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে পারছে না। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক ও কৃষিপ্রধান অঞ্চলের মানুষ। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বারবার ফিরে আসা এই দাবদাহ মূলত জলবায়ু সংকটেরই একটি রূপ।

করাচিতেও তীব্র গরম

আরব সাগরের সমীরণে যে করাচি শহরের তাপমাত্রা সাধারণত সহনীয় থাকে, সেই করাচিও এবার তীব্র গরম থেকে রেহাই পায়নি। মে মাসের প্রথমার্ধেই কয়েকবার এখানকার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদফতর (পিএমডি) জানিয়েছে, সম্প্রতি করাচিতে সর্বোচ্চ ৪৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০১৮ সালের ৩১ মে’র (৪৬ ডিগ্রি) পর মে মাসে সর্বোচ্চ। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন যে, সামনে আরও তপ্ত দিন আসতে পারে।

উপকূলীয় এলাকায় সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব

এই চরম আবহাওয়ার সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে করাচির উপকূলীয় এলাকাগুলোতে, যেখানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। করাচির অন্যতম বৃহত্তম জেলেপল্লি ইব্রাহিম হায়দারির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এখন টিকে থাকাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মাছ ধরার পেশায় জড়িত আব্দুল সাত্তার জানান, সাম্প্রতিক দাবদাহে তার এক সহকর্মী প্রচণ্ড গরমে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে লেবুর শরবত দিই এবং দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। স্যালাইন দেওয়ার পর তার জ্ঞান ফেরে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই জেলেপল্লির মানুষের মনে ২০১৫ সালের সেই ভয়াবহ দাবদাহের স্মৃতি এখনো দগদগে, যখন করাচিজুড়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালের গ্রীষ্মেও হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর ঘটনা করাচির এই চরম আবহাওয়ার দুর্বলতাকে আবারও প্রকাশ করেছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে চাপ

তীব্র গরমের চাপ এখন স্পষ্ট দৃশ্যমান স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে। ইব্রাহিম হায়দারি সরকারি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের প্রধান ডা. সুরেশ কুমার জানান, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ডা. সুরেশ কুমার বলেন, ‘স্বাভাবিক দিনগুলোতে আমরা যেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু দেখতাম, এখন সেই সংখ্যা দৈনিক ২০০ ছাড়িয়ে গেছে।’ তিনি জানান, বেশির ভাগ শিশুই ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণ ও পানিশূন্যতার (ডিহাইড্রেশন) শিকার হচ্ছে, যা তীব্র গরম এবং অনিরাপদ পানির ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ফল

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের দীর্ঘমেয়াদি ফল। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাকিস্তান ও ভারতে এই ধরনের দাবদাহের আশঙ্কা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ফলে বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে এটি আর কোনও ‘ব্যতিক্রমী’ ঘটনা নয়। প্রাক-শিল্পায়নের যুগের আবহাওয়ার তুলনায় বর্তমানের এই দাবদাহের তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ক্লাইমেট অ্যাকশন সেন্টার-এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসির দরিয়া বলেন, করাচির বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির নিচে থাকলেও বাস্তবে তা আরও অনেক বেশি গরম অনুভূত হয়। একই সঙ্গে শহরে গরম রাতের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা আগে খুব একটা দেখা যেত না। এর ফলে মানুষের ঘুম, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে। ইয়াসির দরিয়া আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের পর থেকে গরমের তীব্রতা মারাত্মকভাবে বেড়েছে।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, করাচিতে সাধারণ মানুষের জন্য তাপ-উপশমকারী পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। পাশাপাশি শহরের গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াও এই নগর উষ্ণায়নকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

পিএমডি-এর তথ্যমতে, গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, আর কেবল সিন্ধু প্রদেশেই এই বৃদ্ধির হার প্রায় ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকাল এখন ছোট হয়ে আসছে আর গ্রীষ্মকাল হয়ে উঠছে দীর্ঘ, নিষ্ঠুর ও চরম অনিয়মিত।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয়

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে পাবলিক কুলিং সেন্টার স্থাপন, খাবার পানির সহজলভ্যতা, জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রস্তুত রাখা এবং ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালুর তাগিদ দিয়েছেন। তবে সিন্ধু প্রদেশের বাসিন্দাদের কাছে এই সংকট ভবিষ্যতের কোনও সতর্কবার্তা নয়, এটি এখন তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা, যেখানে চরম গরম এখন কেবল একটি ঋতুভিত্তিক কষ্ট নয়, বরং টিকে থাকার এক নিরন্তর লড়াই।