প্রশান্ত মহাসাগরে সুপার এল নিনোর আশঙ্কা, ইতিহাসের রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা
প্রশান্ত মহাসাগরে সুপার এল নিনোর আশঙ্কা, ইতিহাসের রেকর্ড ভাঙতে পারে

প্রশান্ত মহাসাগরে ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, আগামী শরৎ বা শীতকাল নাগাদ এটি এক বিরল ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে, যা ভেঙে দিতে পারে ইতিহাসের সব রেকর্ড। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ খবর জানিয়েছে।

এল নিনোর বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার তাদের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে, এবারের এল নিনোর সর্বোচ্চ শক্তি ‘ভয়াবহ’ বা ‘অতি শক্তিশালী’ হওয়ার সম্ভাবনা এখন তিন ভাগের দুই ভাগ।

এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানি যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন এটি বায়ুমণ্ডলে বাতাসের ধরণে পরিবর্তন আনে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় এক ধরনের চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয়। কোনও অঞ্চলে খরা ও দাবদাহ দেখা দেয়, আবার কোনও অঞ্চল ভেসে যায় রেকর্ডভাঙা বন্যায়। মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বৈশ্বিক তাপমাত্রা এমনিতেই বাড়ছে, তখন এল নিনো সেই উত্তাপকে আরও উসকে দেবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সুপার এল নিনোর হাতছানি

সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এল নিনো ফিরে আসে এবং এটি ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হলে তাকে এল নিনো বলা হয়। কিন্তু এই উষ্ণতা যদি ২ ডিগ্রির সীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে তাকে বলা হয় ‘ভয়াবহ’ বা ‘সুপার এল নিনো’।

গত মাসেও বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন জুন মাস পর্যন্ত আবহাওয়া নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু বৃহস্পতিবারের আপডেট বলছে, আগামী মাসেই এল নিনোর প্রাথমিক ধাপ শুরু হয়ে যাবে। বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে সঞ্চিত বিশাল উষ্ণ জলরাশি ধীরে ধীরে উপরিভাগে উঠে আসছে। এতে করে শীতকাল পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা এখন ৯৬ শতাংশ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে ‘সুপার এল নিনো’র আঘাত হানার সম্ভাবনা গত মাসে ছিল ২৫ শতাংশ, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে। কিছু কম্পিউটার মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২৬ সালের এই সুপার এল নিনো হতে পারে ১৯৫০ সালের পর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী। এর আগে ১৯৭২, ১৯৮২, ১৯৯৭ এবং সর্বশেষ ২০১৫-১৬ সালে এমন ভয়াবহ রূপ দেখা গিয়েছিল।

পুড়বে বিশ্ব, বাড়বে উত্তাপ

এল নিনোর প্রভাবে ২০২৬ বা ২০২৭ সাল হতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসের উষ্ণতম বছর। নোয়া জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই এটি নিশ্চিত যে, ২০২৬ সালটি ইতিহাসের পাঁচটি উষ্ণতম বছরের একটি হতে যাচ্ছে। এল নিনোর ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ ফ্যাক্টর যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে, তা বলাই বাহুল্য।

তবে প্রকৃতি সব সময় হিসাব মেনে চলে না। ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনোর সময় ক্যারিবীয় অঞ্চলে চরম খরা দেখা দিলেও দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হয়নি।

বিশ্বজুড়ে যেমন প্রভাব পড়তে পারে

এল নিনো কেবল প্রশান্ত মহাসাগরের বিষয় নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে মহাদেশ থেকে মহাদেশে।

এল নিনো সাধারণত আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন তৈরির পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে সেখানে ঝড়ের সংখ্যা কমে। তবে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ফলে হাওয়াই এবং দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের সামুদ্রিক হুমকির সৃষ্টি হতে পারে।

উত্তর যুক্তরাষ্ট্র থেকে পশ্চিম কানাডা ও আলাস্কায় শীতের তীব্রতা কমে গিয়ে আবহাওয়া উষ্ণ থাকতে পারে। তবে দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে জেট স্ট্রিমের প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও ঠান্ডার প্রকোপ বাড়তে পারে।

গ্রীষ্মকালে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যেতে পারে। যার ফলে কৃষিকাজে নেতিবাচক প্রভাব ও খরা পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।

ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকায় খরা দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে শীতকাল হবে শুষ্ক ও উষ্ণ।