যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলাকে 'যুদ্ধাপরাধ' বললেন শতাধিক আইন বিশেষজ্ঞ
ইরান হামলাকে 'যুদ্ধাপরাধ' বললেন যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞরা

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলাকে 'যুদ্ধাপরাধ' বললেন শতাধিক আইন বিশেষজ্ঞ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে পরিচালিত সামরিক হামলাকে জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সম্ভাব্য 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে তারা এই গুরুতর উদ্বেগের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই খবরটি প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী প্রচার করেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ

চিঠিতে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম এবং দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোনও প্রকার অনুমোদন ছিল না এবং ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনও হুমকির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

আইন বিশেষজ্ঞরা তাদের চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'অন্য কোনও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগ কেবল তখনই বৈধভাবে অনুমোদিত যখন সেটি প্রকৃত বা আসন্ন সশস্ত্র আক্রমণের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার্থে করা হয় অথবা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক সরাসরি অনুমোদিত হয়। নিরাপত্তা পরিষদ এই আক্রমণের অনুমোদন দেয়নি এবং ইরানও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো প্রকার আক্রমণ চালায়নি।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চারটি মূল বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের এই তীব্র উদ্বেগ মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এগুলো হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বৈধতা ও আইনি ভিত্তি
  2. যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি ও কৌশলগত দিক
  3. ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হুমকিমূলক ও উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য
  4. প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের কঠোর ও নিয়মবহির্ভূত যুদ্ধকৌশলের অধীনে মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরে বেসামরিক সুরক্ষা কাঠামোগুলো ভেঙে ফেলা

বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার তীব্র সমালোচনা

চিঠিতে যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের মিনাব এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। ওই হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিল নির্দোষ শিশু। এ ছাড়া হাসপাতাল, পানি শোধনাগার এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ঘরবাড়িতে এই ধরনের আঘাত আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট ও গুরুতর লঙ্ঘন।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের নিন্দা

আইন বিশেষজ্ঞরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যেরও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বিশেষ করে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্পের 'শুধু মজার জন্য ইরানে হামলা চালাতে পারে' মন্তব্যের কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথের একটি বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র কোনও 'বোকামি যুদ্ধকৌশল' মেনে যুদ্ধ করে না।

চিঠিতে বলা হয়েছে, 'শীর্ষ কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি উদ্বেগজনক অসম্মান প্রদর্শন করে। অথচ এই আইনগুলো বেসামরিক নাগরিক এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই রাষ্ট্রসমূহ গ্রহণ করেছে।' বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন করদাতাদের প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক দিক থেকেও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।

খ্যাতিমান আইনজ্ঞদের স্বাক্ষর ও আহ্বান

ইয়েল ল স্কুলের ওনা হ্যাথাওয়ে ও হ্যারল্ড কোহ, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ফিলিপ আলস্টন এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক প্রধান কেনেথ রথের মতো বিশ্বখ্যাত আইনজ্ঞরা এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তারা জানান, যেহেতু তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাই তাদের মূল মনোযোগ দেশটির সরকারের আচরণের ওপর। তবে পুরো অঞ্চলজুড়ে নৃশংসতার ঝুঁকি নিয়ে তারা গভীর শঙ্কিত।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত, বিশেষ করে যারা নিজেদের বিশ্বনেতা হিসেবে দাবি করেন। এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার যে ক্ষতি করছে, তা নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা ওয়াশিংটনকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের জরুরি আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আমরা মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রতি সব সময় জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং মানবাধিকার আইন মেনে চলার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি জনসমক্ষে স্পষ্ট করার আহ্বান জানাচ্ছি।'