যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব উত্থাপন
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। শুক্রবার, ২০ মার্চ মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে এই গুরুত্বপূর্ণ রেজোলিউশনটি উপস্থাপন করেন ওহাইও অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডম্যান।
প্রস্তাবের মূল দাবিসমূহ
প্রস্তাবটিতে ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে বাঙালি জাতি এবং বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো বর্বরতাকে ‘গণহত্যা’, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি সহায়তাকারী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে আন্তর্জাতিক বিচারের মুখোমুখি করার সুস্পষ্ট প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্য নথিভুক্ত করা এবং এই ধরণের অপরাধ যেন আর কখনোই পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতেই এই প্রস্তাব আনা হয়েছে বলে রেজোলিউশনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে গভীর পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে, যেখানে এটি আরও বিশদভাবে পরীক্ষা করা হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রমাণাদি
কংগ্রেসম্যান ল্যান্ডম্যানের উত্থাপিত এই রেজোলিউশনে (এইচ. রেজ. ১১৩০) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই বাঙালিদের ‘নিচু জাতের মানুষ’ মনে করত এবং নানাভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করত।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরের সমস্ত আলোচনা ব্যর্থ হয়। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো যৌথভাবে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু করে।
প্রস্তাবে তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্র ও দাফতরিক নথি উদ্ধৃত করা হয়েছে:
- নিহতের সংখ্যার বিষয়ে বলা হয়েছে, যদিও বিভিন্ন তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে, তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তথ্যানুযায়ী নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে কয়েক লক্ষ পর্যন্ত ছিল।
- নারীর ওপর সহিংসতার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধের সময় কমপক্ষে দুই লাখেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন। কলঙ্কের ভয়ে তাদের প্রকৃত সংখ্যা বা সঠিক তথ্য হয়তো কখনোই সম্পূর্ণভাবে জানা যাবে না।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নথিপত্র
প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের ১৩ জুন ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘জেনোসাইড’ শিরোনামের কলামের উদ্ধৃতি দিয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে হত্যার যোগ্য ব্যক্তিদের একটি পূর্বপরিকল্পিত তালিকা ছিল।
এছাড়া তৎকালীন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসুল জেনারেল আর্চার ব্লাড কর্তৃক ওয়াশিংটনে পাঠানো টেলিগ্রামের কথাও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই টেলিগ্রামে আর্চার ব্লাড এই ঘটনাকে ‘বাছাইকৃত গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সরাসরি সহায়তায় হিন্দু ও বাঙালিদের পদ্ধতিগতভাবে হত্যা করা হচ্ছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর লক্ষ্যবস্তু
প্রস্তাবে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা দল-মত নির্বিশেষে বাঙালি নিধন করলেও হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বরের রিপোর্টের বরাতে বলা হয়েছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর পরিকল্পিত ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছিল।
তাদের জমি ও দোকান লুট করা হয় এবং অনেক জায়গায় তাদের গায়ে ‘এইচ’ চিহ্নিত হলুদ রঙ লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সহজেই শনাক্ত করা যায়। ১৯৭২ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস-এর এক আইনি সমীক্ষাতেও হিন্দুদের ওপর এই পরিকল্পিত গণহত্যার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান চারটি দাবি
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত এই প্রস্তাবে চারটি প্রধান দাবি স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে:
- ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চালানো বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানানো।
- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের ইসলামপন্থি সহযোগীরা নির্বিচারে বাঙালি হত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন এবং নারীদের যৌনদাসী হিসেবে আটকে রাখার পাশাপাশি মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ‘নির্মূল’ করার জন্য বিশেষ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল বলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা।
- কোনও একটি জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের কোনও সদস্যের কৃত অপরাধের জন্য সামগ্রিকভাবে দায়ী নয়, এই নীতিটি পুনর্ব্যক্ত করা।
- মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর চালানো এই নৃশংসতাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং ‘গণহত্যা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানানো।
এই প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় আসছে এবং গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের দাবিটি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।



