যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্বীকৃতির প্রস্তাব উত্থাপন
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্বীকৃতির প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্বীকৃতির প্রস্তাব উত্থাপন

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি সভায় উত্থাপিত এই প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের নৃশংস ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রস্তাব উত্থাপন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

গত শুক্রবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন, যা এখন বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রস্তাবটিতে ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত ঘটনাগুলোর পটভূমি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান গঠিত হলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দেশের সম্পদ ও উন্নয়ন প্রচেষ্টা শুধুমাত্র পশ্চিমাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করে। নথিপত্রে প্রমাণিত যে, পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রবল বাঙালি-বিদ্বেষ বিদ্যমান ছিল এবং তাঁরা বাঙালিদের নিচু জাতের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৭০ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ইশতেহার নিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সরকার গঠনের আলোচনা ব্যর্থ হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাবন্দী করে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত উগ্র ইসলামপন্থী দলগুলোর সহায়তায়’ পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন সার্চলাইট নামে দমন অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের আওতায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।

নৃশংসতার মাত্রা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই নৃশংসতায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান থাকলেও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত। দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এবং সামাজিক গ্লানির কারণে তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত কখনো জানা যাবে না।

১৯৭১ সালের ১৩ জুন দ্য সানডে টাইমস-এ ‘জেনোসাইড’ শিরোনামের এক কলামে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘২৫ মার্চ সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী যখন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তাদের অনেকের কাছেই হত্যার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম ছিল।’

ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ২৮ মার্চ ওয়াশিংটনে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ শিরোনামে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থনে অ–বাঙালি মুসলমানরা পরিকল্পিতভাবে গরিব মানুষের বসতিগুলোতে হামলা চালাচ্ছেন এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছেন।’

ব্লাড টেলিগ্রাম ও মার্কিন সরকারের ভূমিকা

৬ এপ্রিল কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওই সংঘাতের বিষয়ে মার্কিন সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠান, যা ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত। ঢাকা কনস্যুলেট জেনারেলের ২০ জন মার্কিন কূটনীতিকের সই করা ওই বার্তায় বলা হয়, ‘দুর্ভাগ্যবশত যেখানে জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দ প্রযোজ্য, সেই “আওয়ামী” সংঘাতকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে আমরা নৈতিকভাবেও হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

৮ এপ্রিল কনসাল জেনারেল ব্লাড আরেকটি টেলিগ্রাম পাঠান, যেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘হিন্দুদের ওপর যে নগ্ন, পরিকল্পিত ও ব্যাপক দমন–পীড়ন চালানো হচ্ছে, তার ক্ষেত্রে “গণহত্যা” শব্দটি পুরোপুরি প্রযোজ্য।’

সিনেট কমিটির প্রতিবেদন ও আইনি মূল্যায়ন

শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতদের সমস্যা তদন্তে গঠিত সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির উপকমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডি ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর কমিটির কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে সুপরিকল্পিত সন্ত্রাস ও গণহত্যা শুরু করেছে, তার চেয়ে স্পষ্ট ও নথিবদ্ধ প্রমাণ আর কিছু হতে পারে না।’

১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইভেন্টস ইন ইস্ট পাকিস্তান’ শীর্ষক এক আইনি গবেষণায় ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্ট-এর সচিবালয় উল্লেখ করেছে, ‘এমন অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, হিন্দুদের হত্যা এবং ঘরবাড়ি ও গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে শুধু হিন্দু হওয়ার কারণে।’

প্রস্তাবের মূল দাবিসমূহ

প্রতিনিধি পরিষদের এই প্রস্তাবে নিম্নলিখিত দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়েছে:

  1. ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চালানো নৃশংসতার নিন্দা জানানো
  2. স্বীকৃতি দেওয়া যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের ‘ইসলামপন্থী’ সহযোগীরা ধর্ম ও লিঙ্গনির্বিশেষে জাতিগত বাঙালিদের নির্বিচার হত্যা করেছেন
  3. স্বীকৃতি দেওয়া যে কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের কোনো সদস্যের করা অপরাধের জন্য দায়ী নয়
  4. ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের সহযোগী ‘জামায়াতে ইসলামী’র পক্ষ থেকে জাতিগত বাঙালি হিন্দুদের ওপর চালানো নৃশংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করা ও স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভুক্তভোগীদের স্মৃতি রক্ষা করা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতা রোধ করা সম্ভব হয়। মার্কিন কংগ্রেসের এই প্রস্তাব সেই লক্ষ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।