যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের ঐতিহাসিক রায়: ভয়েস অফ আমেরিকা পুনরায় চালুর নির্দেশ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বন্ধ করে দেয়া আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'ভয়েস অফ আমেরিকা' (ভিওএ) পুনরায় চালু করার নির্দেশ দিয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক রয়েস ল্যাম্বার্থ এই রায়ে সংবাদমাধ্যমটি বন্ধ করে দেয়ার প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি চাকরি হারানো শত শত সাংবাদিক ও কর্মীদের কাজে ফিরিয়ে আনার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
আদালতের রায়ের মূল বক্তব্য
বিচারক ল্যাম্বার্থ তার রায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এক সপ্তাহের মধ্যে ভয়েস অফ আমেরিকাকে পুনরায় সম্প্রচারে ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সংবাদমাধ্যমটি বন্ধের সিদ্ধান্তটি ছিল খেয়ালখুশিমতো ও অযৌক্তিক। বিশেষ করে, সরকার ভিওএ কোন ভাষা ও অঞ্চলে সম্প্রচার চালাবে সে সংক্রান্ত আইনগত বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নেয়নি বলে আদালত মন্তব্য করে।
ভয়েস অফ আমেরিকার ইতিহাস ও বন্ধের পটভূমি
ভয়েস অফ আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি প্রচারণাকে মোকাবিলা করার জন্য। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের উদ্যোগ নেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভিওএকে 'বামপন্থী পক্ষপাতদুষ্ট' বলে অভিযোগ করেন। একইসঙ্গে ট্রাম্প রেডিও ফ্রি ইউরোপ এবং রেডিও ফ্রি এশিয়ার মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম বন্ধেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কর্মী ছাঁটাই ও আইনি লড়াই
ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারি লেককে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মিডিয়ার (ইউএসএজিএম) প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা ভিওএসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর তদারকি করে। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ক্যারি লেক সংস্থাটির ৮৫ শতাংশেরও বেশি কর্মীকে ছাঁটাই করেন। শুধুমাত্র ভয়েস অফ আমেরিকাতেই এক হাজারের বেশি কর্মী চাকরি হারান। অনেককে গত বছর থেকে বেতনসহ প্রশাসনিক ছুটিতে রাখা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে বিচারক ল্যামবার্থ রায় দেন যে, ক্যারি লেক যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের অনুমোদন না পাওয়ায় ইউএসএজিএম কর্মীদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা তার ছিল না। এই মামলাটি করেছিলেন ভিওএ'র তিনজন সাংবাদিক। তাদের একজন প্যাস্টি উইডাকুসওয়ার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, 'আমরা আশা করি, আমেরিকান জনগণ আমাদের সাংবাদিকতার মিশনকে সমর্থন করে যাবে। প্রচার নয়, সংবাদ পরিবেশনই আমাদের লক্ষ্য।'
ভয়েস অফ আমেরিকার সম্প্রচার ও প্রভাব
বন্ধ হওয়ার আগে ভয়েস অফ আমেরিকা প্রায় ৫০টি ভাষায় টেলিভিশন, রেডিও এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্প্রচার চালাত। ট্রাম্পের ভিওএ-বিরোধী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে তার বৃহত্তর সমালোচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেশটির দর্শকরা ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হিসেবে দেখছেন।
রায়ের তাৎপর্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই রায়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা মেনে চললে ভয়েস অফ আমেরিকা শীঘ্রই তার সম্প্রচার কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে সক্ষম হবে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও তথ্য প্রবাহের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সংকেত পাঠানো হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



