লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডে বিচারের অনুমতি: বেলজিয়ামের আদালতের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা ও কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে হত্যার ঘটনায় দীর্ঘ ছয় দশক পর বেলজিয়ামের একটি আদালত ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়ার অনুমতি দিয়েছেন। ব্রাসেলসের এই সিদ্ধান্তের ফলে লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডে বেলজিয়ামের সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি প্রথমবারের মতো আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে।
অভিযুক্তের পরিচয় ও মামলার পটভূমি
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মামলায় অভিযুক্ত এতিয়েন দাভিগননের বর্তমান বয়স ৯৩ বছর। ১৯৬১ সালে লুমুম্বাকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা এবং তার প্রতি অবমাননাকর আচরণের সঙ্গে দাভিগননের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার সময় তিনি একজন শিক্ষানবিশ কূটনীতিক ছিলেন এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে লুমুম্বার পরিবার যে ১০ জন বেলজীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, তাদের মধ্যে দাভিগননই এখন পর্যন্ত একমাত্র জীবিত ব্যক্তি।
লুমুম্বার জীবন ও নেতৃত্ব
১৯৬০ সালের জুনে বেলজিয়ামের কাছ থেকে কঙ্গোর স্বাধীনতার পর লুমুম্বা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন আফ্রিকার ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। স্বাধীনতা দিবসে বেলজিয়ামের রাজা বোদওয়াইনসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সামনে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে লুমুম্বা কঙ্গোবাসীর ওপর চলা ‘অমানবিক দাসত্বের’ কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এরপর ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে এক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দুই মাস পর তাকে বন্দী করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে বেলজিয়ামের পরোক্ষ সমর্থনে একটি ফায়ারিং স্কোয়াড লুমুম্বা ও তার দুই সহযোগীকে গুলি করে হত্যা করে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর তার মরদেহ অ্যাসিডে গলিয়ে চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের ওই সময়ে পশ্চিমা শক্তিগুলো লুমুম্বাকে সন্দেহের চোখে দেখত। ১৯৭৫ সালে মার্কিন সিনেটের এক তদন্তে দেখা গিয়েছিল, সিআইএ লুমুম্বাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, যদিও তার আগেই তিনি বেলজিয়াম-সমর্থিত বাহিনীর হাতে নিহত হন।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও বেলজিয়ামের অবস্থান
আদালতের এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে লুমুম্বার নাতি মেহদি লুমুম্বা স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, বেলজিয়াম অবশেষে তাদের অন্ধকার ইতিহাসের মুখোমুখি হচ্ছে। উল্লেখ্য, বেলজিয়াম ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য নিজেদের দায় স্বীকার করেছে এবং লুমুম্বার পরিবার ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়া আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



