দুই রমজান বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেন ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী লেকা কোরদিয়া
টানা দুই রমজান মার্কিন অভিবাসন কেন্দ্রে বন্দি থাকার পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ফিলিস্তিনপন্থি অধিকারকর্মী লেকা কোরদিয়া। সোমবার (১৬ মার্চ) টেক্সাসের আলভারাডোর ‘প্রেইরিল্যান্ড ডিটেনশন সেন্টার’ থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
বিশাল অংকের বন্ডের বিনিময়ে মুক্তি
আদালত ১ লাখ ডলারের (প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা) একটি বিশাল অংকের বন্ডের বিনিময়ে তার মুক্তির আদেশ দেন, যা তার আইনজীবীরা ‘অস্বাভাবিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। মুক্তির পর কাঁধে ফিলিস্তিনি কেফায়াহ জড়িয়ে লেকা উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি মুক্ত! দীর্ঘ এক বছর পর অবশেষে আমি স্বাধীন। এই বন্দিশালায় ব্যাপক অবিচার রয়েছে। এমন অনেক মানুষ সেখানে আটকে আছে যাদের সেখানে থাকারই কথা নয়।’
মুক্তির দিন সন্ধ্যায়ই লিকা স্থানীয় মসজিদে রমজানের নামাজে অংশ নেন বলে জানা যায়। এই মুহূর্তটি তার জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কেননা গত দুই রমজান তিনি বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছিলেন।
আটকের প্রেক্ষাপট ও ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা
৩৩ বছর বয়সি এই ফিলিস্তিনি নারী যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বাসিন্দা। ট্রাম্প প্রশাসনের ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে গত বছর মার্চ মাসে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলেন। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দাবি করে, লিকা তার স্টুডেন্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন।
তবে লিকার আইনজীবীদের মতে, এটি একটি ‘ইসলামোফোবিক এবং ফিলিস্তিন-বিরোধী’ পদক্ষেপ। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভের জেরে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে লিকাই ছিলেন সর্বশেষ বন্দি। তার আইনজীবীরা আরও উল্লেখ করেন যে, ভিসা স্ট্যাটাস নিয়ে জটিলতা সাধারণত প্রশাসনিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে তাকে অপরাধীর মতো দীর্ঘকাল বন্দি থাকতে হয়েছে।
বন্দিশালায় অমানবিক অবস্থার অভিযোগ
ডিটেনশন সেন্টারে থাকাকালে লিকার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। গত মাসে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান এবং প্রথমবারের মতো তার খিঁচুনি দেখা দেয়। এমনকি হাসপাতালে তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকাকালীন তাকে বিছানার সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল।
এছাড়াও বন্দিশালায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অখাদ্য পরিবেশন এবং ধর্মীয় আচার পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ফিলিস্তিনপন্থি এই আন্দোলনকারী। তার পরিবার জানায়, গাজায় ইসরাইলি হামলায় তাদের বংশের প্রায় ২০০ সদস্য নিহত হয়েছেন, যা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল এবং এই ট্রমা তার বন্দিদশাকে আরও কঠিন করে তোলে।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া
এমন অমানবিক কাণ্ডে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, তিনি গত মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে লেকার বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। পাশাপাশি লেকার মুক্তির সংবাদে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। এই ঘটনাটি মার্কিন অভিবাসন নীতির কঠোরতা এবং ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যের প্রশ্নটি আবারও সামনে এনেছে।
লেকা ২০১৬ সালে ফিলিস্তিন থেকে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তার আইনজীবীরা জানান, ভুল পরামর্শের কারণে তার ভিসার স্ট্যাটাস নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এই মুক্তি যদিও একটি ইতিবাচক ঘটনা, তবুও এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
