ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে জয় দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করেছে। ১০ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই সীমান্ত রাজ্যে প্রথমবারের মতো বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। ঘোষিত ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০-তে। একটি আসনে পুনরায় ভোট গ্রহণ হবে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিতর্ক
এই বিশাল বিজয় ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিলেও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার একটি ব্যাপক ও বিতর্কিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম চালায়। কমিশনের দাবি ছিল, নকল, মৃত বা ‘অযোগ্য’ ভোটারদের বাদ দিতেই এই উদ্যোগ। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রায় ৯০ লাখ নাম—যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ—শুরুতেই এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসে, যার বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বাদ পড়ে।
ভোটার বাদ পড়ার প্যাটার্ন
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম, অভিবাসী শ্রমিক এবং দরিদ্র ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে; বিশেষ করে সেই সব জেলায় যেখানে বিজেপি ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে ছিল। বিজেপির জয়ী হওয়া অনেক আসনেই দেখা গেছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। মনে হচ্ছে ভারত যেন নির্বাচনী বিকৃতি ছাড়িয়ে এখন ‘গণ-ভোটাধিকার হরণ’-এর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ গুরুত্ব
বাংলা ভারতের অন্য দশটি রাজ্যের মতো নয়। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এই রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্ত রয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক মানসে বাংলার স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম এবং তারা ঐতিহ্যগতভাবে বিজেপির উত্থান ঠেকাতে কৌশলগত ভোট দিয়ে আসছিল। ঠিক এই কারণেই মোদির কাছে বাংলা জয় এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রভাব
পুরো বিতর্কের মূলে ছিল ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া। ২০২৫ সালের জুনে বিহারে এটি প্রথম চালু হয় এবং পরে পশ্চিমবঙ্গসহ নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় বুথ লেভেল অফিসাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার যাচাই করেন। নাগরিকদের অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে নথিপত্র দিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রমাণ করতে বলা হয়। ব্যর্থ হলে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়ার নিয়ম করা হয়। ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে সর্বজনীন ভোটাধিকার গ্রহণের পর এই প্রথম ভারতে ভোটাধিকার প্রমাণের দায়ভার রাষ্ট্রের বদলে খোদ নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক চুক্তির এক বিপজ্জনক লঙ্ঘন।
অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব
এই প্রক্রিয়া অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর চরম আঘাত হেনেছে। বিহার ও বাংলা ভারতের অভিবাসী শ্রমের অন্যতম বড় উৎস। লাখ লাখ মানুষ ভিন রাজ্যে কাজ করেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের পক্ষে বাড়ি ফিরে নথিপত্র দেখানো সম্ভব ছিল না। এছাড়া নামের বানান ভুল, উত্তরাধিকার নথির অভাব বা বিয়ের পর পদবি পরিবর্তনের মতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়েন অনেকে। বিশেষ করে মুসলিম এবং দরিদ্র নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা ছিল প্রকট।
রাজনৈতিক অভিযান
নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, এটি ছিল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বিজেপি একে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসা কথিত নথিপত্রহীন মুসলিমদের হঠানোর উপায় হিসেবে প্রচার করেছে। কিন্তু বাংলায় এই পুরো কার্যক্রম একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিযানের রূপ নেয়। যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি, সেখানেই ভোটার বাদ পড়ার হার ছিল সর্বোচ্চ। এআই-চালিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি বানানের অসংগতি খুঁজে বের করে মুসলিমদের নাম বেশি করে ‘ফ্ল্যাগ’ করা হয়।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া
তৃণমূল কংগ্রেস বারবার অভিযোগ করেছে যে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে কাজ না করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। ভারতের সুপ্রিমকোর্ট কয়েকবার হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। ভোটার তালিকা থেকে নাম উধাও হওয়ার পর লাখ লাখ মানুষ আপিল করেছিলেন। কিন্তু ভোটের আগে প্রায় ৩৪ লাখ আপিল ঝুলে ছিল, যার মধ্যে মাত্র ২ হাজারেরও কম নিষ্পত্তি হয়েছে। আদালত রায় দেন যে, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন না। এই রায়ের মাধ্যমে কার্যত বিশাল পরিসরে ভোটাধিকার হরণকে বৈধতা দেওয়া হলো।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এই প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছি। উত্তর প্রদেশে আমার পরিবারকে ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখতে পুনরায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে। বাংলার তুলনায় সেখানে সময় কিছুটা বেশি পাওয়া গেলেও পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল হয়রানিমূলক। বয়স্ক মানুষ, অভিবাসী এবং দরিদ্রদের জন্য এই আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব ছিল। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেছেন যে, হিন্দু ভোটারদের তুলনায় মুসলিমদের নাম বাদ পড়ার ভয় ছিল অনেক বেশি।
পরিসংখ্যান ও ফলাফল
শেষ পর্যন্ত বাংলায় প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ পড়ে। নির্বাচনের দিন আরও কয়েক লাখ মানুষের আপিল অমীমাংসিত থেকে যায়। বিজেপি মোট ভোট পেয়েছে ২,৯২,২৪,৮০৪টি, যা তৃণমূলের (২,৬০,১৩,৩৭৭) চেয়ে ৩২,১১,৪২৭টি বেশি। আসনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিজেপি যেসব আসনে জিতেছে, সেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাপিয়ে গেছে। তাই এই দাবি করা সংগত যে, নির্বাচনী ফলাফল রাষ্ট্রযন্ত্র ও নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় ‘ছিনতাই’ হওয়ার সন্দেহ অমূলক নয়। যদিও কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল নিরপেক্ষ থাকা।
হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা ও কৌশল
বিজেপির এই বিজয় সম্ভব হয়েছে একটি কট্টর হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার মাধ্যমেও, যেখানে মমতার সরকারকে ‘মুসলিম তোষণকারী’ হিসেবে অতিরঞ্জিত করে হিন্দুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পর বিজেপি তাদের নির্বাচনী কৌশলে পরিবর্তন আনে। এর একটি অংশ ছিল আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ, যা উত্তর ভারতের হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাগুলোর অনুকূলে যাবে। আসামেও এই সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে মুসলিমদের নির্বাচনী প্রভাব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো এই ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া, যার বড় প্রভাব দেখা গেল বাংলায়। আর তৃতীয়টি হলো ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ ব্যবস্থা। প্রশাসনিক সংস্কার বলা হলেও, এর লক্ষ্য হলো মোদির হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এবং আঞ্চলিক দলগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া।
গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তন
এই সব উন্নয়ন একত্রে এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে স্থায়ীভাবে বদলে ফেলার চেষ্টা চলছে। ভারতের বিশাল অংশ এখন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের কব্জায়। নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে ভারতের বর্তমান ধারণা ও ভাবমূর্তি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তার জায়গায় জেঁকে বসছে এক কর্তৃত্ববাদী ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ব্যবস্থা।
লেখক: দিল্লিভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বই ‘নরেন্দ্র মোদি: দ্য ম্যান, দ্য টাইমস’।



