ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ: ফাঁদে আটকে পড়া প্রেসিডেন্টের অচলাবস্থা
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ: ফাঁদে আটকে পড়া প্রেসিডেন্টের অচলাবস্থা

যদি শুধু ‘কথা’ দিয়েই যুদ্ধ জেতা যেত তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে অনেক আগেই জয়ী হয়ে যেতেন। কিন্তু যে যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, সেই যুদ্ধ এখনও ‘শেষ হয়েও হলো শেষ’ অবস্থায়। জয় পাওয়া তো দূরের কথা ট্রাম্প এখন এই সংঘাত থেকে সম্মানজনক প্রস্থানের উপায় খুঁজছেন।

ট্রাম্পের ফাঁদ

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প নিজের তৈরি দুটি ফাঁদে আটকে গেছেন। একটি ভূরাজনৈতিক, অন্যটি অভ্যন্তরীণ। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব এবং নতি স্বীকার না করার অবস্থান তাকে এমন অবস্থায় ফেলেছে। এর ফলে তিনি সামরিক দৃষ্টিকোন থেকে যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি টানতে পারছেন না।

ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এর রাজনৈতিক প্রভাবও বিকল্পগুলোকে আরও সীমিত করে দিচ্ছে। ৩০ এর ঘরে থাকা ট্রাম্পের রেটিং, গ্যালনপ্রতি গড়ে সাড়ে চার ডলারের বেশি জ্বালানি মূল্য এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনসমর্থন বাড়তে থাকায়, এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনও রাজনৈতিক অবস্থান তার হাতে আর নেই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অচলাবস্থা ও শান্তি আলোচনা

ট্রাম্প একটি অচলাবস্থায় আটকে আছেন। আর এর ফলেই তিনি শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়ে বারবার অতিরিক্ত আশাবাদী দাবি করেন এবং কোনও ইঙ্গিত ছাড়াই সামরিক কৌশল ঘোষণা বা পরিবর্তন করার প্রবণতা দেখান। আশার কথা হলো, এখন দুই দেশ এবং মধ্যস্থতাকারী তৃতীয় পক্ষ পাকিস্তানের মধ্যে একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই নথির মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো হবে এবং পরবর্তী ৩০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে, যার মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এটি ট্রাম্পের সরলীকরণের প্রতি আগ্রহের সঙ্গে মানানসই হতে পারে। কিন্তু, এক পৃষ্ঠার একটি নথি যদি উভয় পক্ষ মেনে নেয় তাহলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধশতাব্দীজুড়ে থাকা জটিল ইস্যুগুলো চূড়ান্তভাবে সমাধানের জন্য যথেষ্ট বলে মনে হয় না। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক আলোচনা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত সংঘাত।

ইরানের চাহিদা

এছাড়া রয়েছে ইরানের ব্যাপক চাহিদা। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল চায় তারা। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল থেকে মুনাফা করারও সুযোগ চায়, যেটিকে তারা ইতোমধ্যে একটি বড় কৌশলগত সুবিধায় পরিণত করেছে।

ইরান বৃহস্পতিবার পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিষয়ে তাদের জবাব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিছু সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান আলোচনা যুদ্ধ শেষের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কাছাকাছি অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্পের কৌশলগত বিভ্রান্তি

তবে, ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহে একাধিকবার দাবি করেছেন ‘চুক্তি’ প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং তেহরান তার সব দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের অটল অবস্থানের কারণে সেই অগ্রগতি বারবার ভেস্তে গেছে। এই যুদ্ধ শুরু থেকেই কৌশলগত বিভ্রান্তি, আকস্মিক পরিবর্তন ও এটি কীভাবে শেষ হবে তা নিয়ে অস্পষ্টতায় ভরা ছিল। আর এই প্রবণতা এখন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। যেমন- গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত অভিযানটি শেষ হয়েছে। এর ঘণ্টাখানেক সময় পর আরেকটি অভিযানের পক্ষে সাফাই দেন। ওই অভিযানটির কথা জানিয়েছিলেন খোদ ট্রাম্প, যার উদ্দেশে ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। কিন্তু, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত হয়ে যায়।

স্বল্পস্থায়ী ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ছিল ট্রাম্পের সর্বশেষ সেই কৌশলের প্রয়োগ, যাকে কোয়িন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট’র ইরান বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি ‘সিলভার বুলেট’ কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

ইরানের শাসনব্যবস্থা অটুট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মারা যান। এরপর সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়। পরে ইরানি জাহাজ ও বন্দরের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয়। এরপর আসে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার বন্ধ হয়ে যায়।

এসব আকস্মিক পদক্ষেপের কোনোটিই ইরানের শাসনব্যবস্থাকে টলাতে পারেনি। বরং, নিহত শীর্ষ নেতাদের স্থানে নতুন কট্টরপন্থিদের নিয়োগের মাধ্যমে কাঠামো আরও দৃঢ় হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণেও বিভাজনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যা হয়তো শাসনব্যবস্থার পতনের ইঙ্গিত দিতে পারতো। ইরানের কঠোর শাসকেরা এই যুদ্ধকে তাদের মৌলিক ইসলামি বিপ্লবের অস্তিত্ব সংকট হিসেবে দেখছে। ফলে টিকে থাকাকেই তারা এক ধরনের বিজয় হিসেবে বিবেচনা করছে।

সামরিক সীমাবদ্ধতা

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরানের নৌ ও বিমান বাহিনী ধ্বংস করা হয়েছে এবং তাদের সামরিক শিল্প অবকাঠামোতে গুরুতর ক্ষতি করা হয়েছে। এর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে, ট্রাম্পের হাজার হাজার স্থলসেনা মোতায়েন না করার সিদ্ধান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাস বিবেচনায় এটি একটি বিচক্ষণ আত্মসংযমের পদক্ষেপ। এর ফলে একটি স্পষ্ট ও নির্ধারিত সামরিক বিজয় শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত ছিল না। মার্কিন অভিযানগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি দখলের মাধ্যমে ইরানের পাওয়া কৌশলগত সুবিধা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও তৈরি করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রকে আরও জটিল ও অস্পষ্ট করে তুলেছে।

জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’র ফেলো ইয়ান লেসার বলেন, এই সংঘাতের পুরো বিবর্তনই দেখায় যে আমেরিকার অপারেশনাল সক্ষমতা অনেক বড় হলেও, সেটিকে অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টিতে সফল বলা যায় এমন কৌশলগত ফলাফলে রূপ দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।

ইরানের প্রতিরোধ

ইরানিদের পক্ষ থেকে শাসকদের বিরুদ্ধে কোনও গণঅভ্যুত্থান এখনও দেখা যায়নি। ইরান এখনও যাচাইযোগ্যভাবে তার পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেনি বা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরে সম্মত হয়নি। এছাড়া লেবানন বা গাজায় তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে না, এমন কোনও নিশ্চয়তাও দেয়নি।

অ্যাসপেন সিকিউরিটি ফোরামের নির্বাহী পরিচালক আঞ্জা ম্যানুয়েল বলেন, “এই সংঘাত এখনও শেষ হয়নি।”

জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের সময়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা ম্যানুয়েল আরও বলেন, আপনি অপারেশনের নাম পরিবর্তন করতে পারেন, যুদ্ধবিরতি চালু বা বন্ধ ঘোষণা করতে পারেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো হরমুজ প্রণালি এখনও বন্ধ রয়েছে। আমরা ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোকে বাধা দিচ্ছি, তেলের দাম আকাশছোঁয়া, আমেরিকান কোম্পানিগুলো ক্ষতির মুখে এবং এই সংঘাত সমাধান হওয়া থেকে অনেক দূরে রয়েছে।

সমাধানের পথ

মঙ্গলবার মার্কো রুবিও হোয়াইট হাউস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পের অবস্থান পুনরাবৃত্তি করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সব কার্ডই নিজেদের হাতে রেখেছে। মার্কিন নৌ অবরোধ শেষ পর্যন্ত ইরানকে নতজানু করবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন কথার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাগত অবস্থানের দুর্বলতাগুলো হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা, ইরানের অসহায় বেসামরিক জনগণ, উচ্চ জ্বালানি মূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন নাগরিক এবং ট্রাম্পের যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বার্থে দ্রুত একটি সমাধান অত্যন্ত জরুরি।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্পষ্টতা, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল অগ্রগতির বিষয়ে তার আশাবাদী ধারণা এবং মাত্র এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতাকে শান্তির চাবিকাঠি হিসেবে দেখার প্রবণতা, এসবই প্রশাসনের আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি করছে।