বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা ‘মে দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু খোদ পুঁজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্রে দৃশ্যপট একদম আলাদা। সেখানে শ্রমিকদের সম্মানে জাতীয় ছুটি পালিত হয় প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার। তবে এই তারিখ পরিবর্তনের পেছনে কেবল কোনও সাধারণ পছন্দ কাজ করেনি; বরং পহেলা মে-র বৈশ্বিক আন্দোলন ও পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রামের চেতনাকে ম্লান করতে এটি ছিল এক সচেতন রাজনৈতিক কৌশল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের উত্তাল সংঘাত, শোষণ এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের পথ ধরেই রচিত হয়েছিল আমেরিকার এই ভিন্নধর্মী ‘শ্রমিক দিবস’।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নতি
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র যখন দ্রুত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নতির শিখরে পৌঁছাচ্ছিল, সেই সময়টিকে বলা হয় স্বর্ণালি যুগ। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে ছিল আধুনিক কর্পোরেট পুঁজিবাদের চরম শোষণ। শিল্পপতিরা নামমাত্র মজুরিতে শ্রমিকদের দিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটাতেন। মুনাফার লোভে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবনের তোয়াক্কা না করে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো দীর্ঘ কর্মঘণ্টা।
শ্রমিক ইউনিয়নের উত্থান এবং শিল্পপতিদের প্রতিক্রিয়া
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ১৮৬৯ সালে নাইটস অব লেবার-এর মতো বড় শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। তারা শুধু বেশি মজুরি নয়, বরং একটি প্রকৃত শিল্প-গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায় সম-অধিকারের দাবি তোলে। তবে এই জাগরণে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শিল্পপতিরা। তারা শ্রমিকদের দমাতে নিয়োগ করে ‘পিঙ্কারটন’ নামে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা বাহিনী এবং সশস্ত্র প্রহরী। ফলে পুঁজি আর শ্রমের মধ্যে সংঘাত ছিল তখনকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
রক্তাক্ত হে-মার্কেট এবং পহেলা মে-র ‘নিষিদ্ধ’ ইতিহাস
১৮৮৬ সালের মে মাসে আমেরিকার শ্রমিক আন্দোলন এক চূড়ান্ত মোড় নেয়। দেশজুড়ে আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। শিকাগো শহরে ৩ মে পুলিশের গুলিতে চারজন শ্রমিক নিহত হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে ৪ মে হে-মার্কেট স্কয়ারে আয়োজিত সমাবেশে একটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটলে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। পুলিশ তৎক্ষণাৎ ভিড়ের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে, যাতে অসংখ্য মানুষ হতাহত হন।
এই ঘটনার পর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলো সব দোষ শ্রমিক ও নৈরাজ্যবাদীদের ওপর চাপিয়ে দেয়। কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই আটজন শ্রমিক নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং তাদের চারজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই ট্র্যাজেডিই বিশ্বজুড়ে পহেলা মে-কে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের প্রতীক করে তোলে। কিন্তু মার্কিন সরকার পহেলা মে-র এই ‘বিপ্লবী’ ভাবমূর্তিকে ভয় পেতে শুরু করে।
কোম্পানি টাউন এবং পুলম্যান স্ট্রাইক
১৮৯০-এর দশকের শুরুতে শিল্পপতিরা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে আরও কৌশলী হয়ে ওঠেন। জর্জ এম. পুলম্যানের মতো ব্যবসায়ীরা গড়ে তোলেন ‘কোম্পানি টাউন’, যেখানে শ্রমিকরা কাজ করার পাশাপাশি কোম্পানির দেওয়া ঘরেই থাকত এবং কোম্পানির দোকান থেকেই জিনিস কিনত। একবার অর্থনৈতিক মন্দার সময় পুলম্যান মজুরি কমিয়ে দিলেও ঘরভাড়া ও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন।
এর প্রতিবাদে ১৮৯৪ সালে শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘পুলম্যান স্ট্রাইক’। রেলওয়ে ইউনিয়নের নেতা ইউজিন ভি. ডেবসের নেতৃত্বে এই ধর্মঘট সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড তখন রেল পরিষেবা সচল করার অজুহাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী পাঠান। সামরিক হস্তক্ষেপে ধর্মঘট ভেঙে দেওয়া হয় এবং ডেবসসহ ইউনিয়ন নেতাদের জেলে পাঠানো হয়।
সেপ্টেম্বরের ‘শ্রমিক দিবস’ এবং সমঝোতার কৌশল
পুলম্যান স্ট্রাইক এবং হে-মার্কেটের মতো ঘটনাগুলো যখন পহেলা মে-র সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন মার্কিন আইনপ্রণেতারা শ্রমিকদের শান্ত করতে একটি জাতীয় ছুটির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তবে তারা সচেতনভাবেই পহেলা মে-কে এড়িয়ে যান, যাতে শ্রমিক আন্দোলনের উগ্র বা বিপ্লবী ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়।
১৮৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিভল্যান্ড সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবারকে ‘কেন্দ্রীয় ছুটির দিন’ হিসেবে ঘোষণা করার বিলে স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল মূলত শ্রমিকদের প্রতি একটি সান্ত্বনা পুরস্কার। মে মাসের আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের বৈপ্লবিক চেতনা থেকে আমেরিকানদের দূরে রাখাই ছিল এই তারিখ নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য।
আজও যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর মাসে লেবার ডে পালন করা হয়। যদিও সাধারণ মানুষ দিনটিকে কেবল একটি ছুটির দিন হিসেবেই দেখে।



