ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে ১৮ দিনের শিশুসহ নারী উদ্ধার
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে ১৮ দিনের শিশুসহ নারী উদ্ধার

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৮ দিন বয়সী নবজাতক সন্তানসহ এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ওই নারী ডায়ানা প্যাটিনো জানিয়েছেন, অন্ধকার, আতঙ্ক আর ব্যথার মধ্যেও তাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছে তার ছোট্ট ছেলে হুয়ান ডেভিড। রোববার (২৮ জুন) কারাকাসের একটি ক্লিনিকে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডায়ানা প্যাটিনো সেই ভয়ঙ্কর সময়ের বর্ণনা দেন।

বেঁচে থাকার লড়াই

ডায়ানা বলেন, 'যতক্ষণ আমার ছেলে বেঁচে ছিল, ততক্ষণ আমিও বেঁচে থাকব। এটাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। প্রতি মুহূর্তে আমি তার নাকের কাছে হাত রেখে দেখতাম সে শ্বাস নিচ্ছে কি না।' উদ্ধারের ফুটেজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর নবজাতক হুয়ান ডেভিড হয়ে উঠেছে আশার প্রতীক।

ভূমিকম্পের ভয়াবহতা

গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে রাজধানী কারাকাসসহ লা গুয়েরা, অন্যান্য শহরে বহুতল ভবন ধসে পড়ে। এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ১,৪৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস আশঙ্কা করছে, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এ ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেছেন। এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজ চললেও জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমশ কমে আসছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উদ্ধার অভিযানের বর্ণনা

কারাকাসের একটি ক্লিনিকে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডায়ানা প্যাটিনো সেই ভয়ঙ্কর সময়ের বর্ণনা দেন। ভূমিকম্পের সময় তিনি লা গুয়েরার উত্তর উপকূলীয় এলাকায় অষ্টম তলার অ্যাপার্টমেন্টে বাসন ধুচ্ছিলেন। হালকা কম্পন অনুভব করে তিনি দ্রুত ছেলেকে কোলে তুলে নেন। তিনি বলেন, 'মনে হচ্ছিল আমি যেন উড়ে যাচ্ছি। তারপর পানি আর আবর্জনার নিচে তলিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ একটা গর্তের মধ্যে পড়ে গেলাম। কীভাবে যে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম, সেটা এখনো ভেবে পাই না। আসবাবপত্রের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি, চারদিকে সবকিছু ভেঙে পড়ছিল।'

প্রথমে চিৎকার করলেও পরে বুঝতে পারেন কেউ শুনছে না। তখন নিজেকে সামলান ডায়ানা। বলেন, 'আমি ঠিক করলাম, শক্তি নষ্ট করে চিৎকার করব না। যখন সত্যিই কারও গলার আওয়াজ বা পায়ের শব্দ পাব, তখনই চেঁচাব।' তার বাম পা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছিল, মাথার একপাশ পাথরের সঙ্গে চেপে ছিল। নড়াচড়া করারও উপায় ছিল না। এমন সময় শরীরের নিচে একটা বাইবেল অনুভব করে তিনি আশায় বুক বাঁধেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বেঁচে থাকার লড়াই।

অন্ধকারে আলোর সন্ধান

অন্ধকারের মধ্যে সুঁচের ছিদ্রের মতো ছোট্ট একফালি আলো দেখতে পেতেন তিনি, যা চাঁদের মতো মনে হতো। অবশেষে ভাইয়ের গলায় নিজের নাম শুনে চিৎকার করে ওঠেন। ভাই তাকে আশ্বাস দেন, 'আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। তোমাকে না বের করা পর্যন্ত এখান থেকে যাব না।' ভাই সেই কথা রেখেছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে জটিল উদ্ধার অভিযানের পর মা-ছেলেকে বের করে আনা হয়। ডায়ানার দুই পা-ই আহত হয়েছে, তবে হুয়ান ডেভিডের শুধু সামান্য চোট লেগেছে।

স্বামীর প্রতিক্রিয়া

ডায়ানার স্বামী গেরসন তখন বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করছিলেন। ভূমিকম্প শুরু হতেই তিনি একটা বেড়া টপকে নিরাপদ জায়গায় চলে যান। ভবনের দশা দেখে তিনি সবাইকে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা করেছিলেন। স্ত্রী-সন্তানকে জীবিত ফিরে পাওয়াটা তাঁর কাছে ছিল অলৌকিক। এই ঘটনা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মাঝেও মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইল।