ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা টানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৩৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন চার হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ। ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় দেশটিকে সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে প্রতিবেশী দেশগুলো।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য ও হতাহতের সংখ্যা
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, আজ শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভেনিজুয়েলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদো হতাহতের এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমরা প্রায় ২৩৫ জন এমন রোগী পেয়েছি, যারা আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন অথবা আসার পরপরই প্রাণ হারিয়েছেন।’ আলভারাদো জানান, হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সিংহভাগই রেকর্ড করা হয়েছে দেশটির উত্তরের উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায়া। ভূকম্পনে এই অঞ্চলটি সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থার বিপর্যয়
বিপর্যস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যেই রোগীতে পূর্ণ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল যুক্ত করেছি।’ স্থানীয় সূত্র জানায়, লা গুয়াইরার মূল হাসপাতালটি ভূমিকম্পে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসকদের খোলা রাস্তায় বা ফুটপাতে রেখেই আহতদের জরুরি চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে ওই অঞ্চলে বর্তমানে সব ধরনের টেলিফোন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা বন্ধ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা
এদিকে ভেনিজুয়েলার এই সংকটে আন্তর্জাতিক উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রতিবেশী কলম্বিয়া সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের জাতীয় লজিস্টিক সেন্টার থেকে একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল ভেনিজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৬২ জনেরও বেশি উদ্ধারকর্মী ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী কুকুর নিয়ে প্রথম ফ্লাইটটি শুক্রবার ভোরেই ভেনিজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। পরবর্তীতে ওই দিনই দ্বিতীয় আরেকটি ফ্লাইটে ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম ও কারিগরি সামগ্রী পাঠানো হবে। দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় এই দলটিকেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে পাঠানো হতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্যোগ মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এই সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহায়তা কেবল তাৎক্ষণিক জীবন বাঁচাতেই নয়, বরং হাজার হাজার আহতের চিকিৎসা ও মানবিক প্রয়োজন মেটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভূমিকম্পটি এমন এক সময় ভেনিজুয়েলায় আঘাত হেনেছে, যখন দেশটি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে অর্থনৈতিক মন্দা ও সামাজিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। দুর্যোগের আগেই দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছিল। গত ১৫ বছরের অর্থনৈতিক পতনের প্রভাবে পানি, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসহ অধিকাংশ জনসেবা খাত কার্যত ভেঙে পড়েছে। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে অনেক হাসপাতালও স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম পরিসরে সেবা দিয়ে আসছিল। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গত দেড় দশকে অন্তত ৮০ লাখ মানুষ উন্নত জীবনের সন্ধানে ভেনিজুয়েলা ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। দেশত্যাগকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকৌশলী, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন খাতের দক্ষ পেশাজীবী থাকায় ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে জনবল সংকটে পড়েছে দেশটি।



