চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, ঝুঁকিতে দেড় লাখ মানুষ
চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, ঝুঁকিতে ১.৫ লাখ

চট্টগ্রামে টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। বুধবার (৮ জুলাই) পৃথক পাহাড়ধসে আরও দুই শিশু মারা গেছে। এখনও ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড় ও আশপাশে কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ বসবাস করছে, যদিও সরকারি হিসাবে সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৬ হাজার। ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে আনা যাচ্ছে না।

পাহাড়ধসে নিহত দুই শিশু

বুধবার সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম তানভীর নামে এক শিশু নিহত হয়। সে ওই এলাকার মহিন উদ্দিনের ছেলে। এ ঘটনায় পরিবারের আরও কয়েকজন আহত হন। একই দিন দুপুরে নগরের পাঁচলাইশ থানার চশমা হিল এলাকায় পাহাড়ধসে সুমাইয়া আক্তার (১২) নামে আরেক শিশু মারা যায়।

ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও বসতি

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নগরে ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে ১৬টি সরকারি ও ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। সরকারি পাহাড়ে ৬ হাজার ১৭৫টি এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে ৩৮৩টি পরিবার বাস করে। তবে ২০২৩ সালের পর পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারের হালনাগাদ তালিকা করেনি প্রশাসন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর মধ্যে রয়েছে আকবর শাহ থানার ফয়’স লেক সংলগ্ন ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল এলাকার পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলি ঘোনা, জঙ্গল সলিমপুর পাহাড়, বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন পাহাড়, ফিরোজ শাহ কলোনি পাহাড়, লালখান বাজারের মতি ঝরনা পাহাড়, বাটালী হিল, পোড়া কলোনি পাহাড়, টাংকির পাহাড়, ষোলশহর রেলস্টেশন সংলগ্ন পাহাড়, বিজয়নগর পাহাড়, আমিন জুট মিলস পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, বর্মা কলোনির পাহাড়, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, লেক সিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়, এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির পাহাড়, ইস্পাহানী পাহাড় এলাকা ও সিডিএ অ্যাভিনিউ সংলগ্ন কয়েকটি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আকবর শাহ থানার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি অবৈধ বসতি রয়েছে। শুধু এই এলাকায় ৪ হাজার ৪৭৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, যা মোট ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের প্রায় ৬৮ শতাংশ। পরিবারপ্রতি গড়ে চার থেকে পাঁচ জন করে বসবাস করলে মোট ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার।

আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নগরে এখনও ৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি। ৯৪টি আশ্রয় কেন্দ্র থাকলেও খোলা হয়েছে মাত্র ১০টি, যেখানে আশ্রয় নিয়েছে ১ হাজার ২২২ জন। এসব কেন্দ্রে শুকনো ও রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অধিকাংশ মানুষ ঘরবাড়ি ও মালামাল ফেলে যেতে না চাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে রাজি হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বলেন, ‘শুধুমাত্র নগরে পাহাড় এবং আশপাশের এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ বসবাস করছে। নগরের কাছে জঙ্গল সলিমপুরে কমপক্ষে ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করছে। এর মধ্যে বুধবার পাহাড়ধসে এক শিশু মারা গেছেন। পাহাড়ে কতজন বসবাস করছে, প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে এটার সমীক্ষা থাকা প্রয়োজন। তাহলেই প্রকৃত তথ্য বের হয়ে আসতো।’

প্রশাসনের পদক্ষেপ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়গুলো এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো সময় আবার ধস নামতে পারে। তাই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী সবাইকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আরবান হেলথ সেন্টারকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমরা বারবার মাইকিং করছি, প্রয়োজন হলে চাপ প্রয়োগও করছি, যাতে মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যায়।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিম দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিটি এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে মাঠে কাজ করছেন।’