চট্টগ্রামে টানা চতুর্থ দিনের মতো ভারি বর্ষণে পাহাড় ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
পাহাড় ধসে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
বুধবার (৮ জুলাই) নগরীর পাঁচলাইশ থানার চশমা হিল এলাকায় পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে সুমাইয়া আক্তার নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশু মারা গেছে। অন্যদিকে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে একই ঘটনায় আশরাফুল ইসলাম তানভীর নামে ১০ মাস বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জোন-৪ এর উপসহকারী পরিচালক শাহ ইমরান বলেন, “দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে পাহাড় ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দুর্ঘটনার সময় ঘরে থাকা সুমাইয়ার মা-বাবা বের হয়ে যেতে সক্ষম হলেও পাশের কক্ষে থাকা সুমাইয়া বের হতে পারেনি। ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।” সুমাইয়া ওই এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেনের মেয়ে।
সীতাকুণ্ডে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের কিনারে থাকা ঘরের উপর মাটি ধসে পড়ে। এ সময় শিশুটি গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তার মৃত্যু হয়। তানভীর ওই এলাকার বাগানবাড়ির বাসিন্দা মহিন উদ্দীনের ছেলে। বুধবার সকাল ১০টার দিকে জঙ্গল সলিমপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জলাবদ্ধতায় স্থবির নগরজীবন
টানা বর্ষণে নগরীর কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, ওয়াসা মোড়, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাদামতলী, চান্দগাঁও, মোহরা, হালিশহর, পতেঙ্গা, চকবাজার ও বন্দর এলাকার নিম্নাঞ্চলে বিভিন্ন সড়কে হাঁটু থেকে গলা সমান পানি জমে যায়। অনেক স্থানে সড়ক ও ড্রেন একাকার হয়ে যাওয়ায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করে। কিছু এলাকায় ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং কোথাও কোথাও পানিতে আটকা পড়ে মালবাহী ট্রাক।
স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হলেও সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত খোলা ছিল। সড়কে বের হয়ে কর্মজীবী মানুষদের ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়েছে। অনেক বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ
পানি না কমা পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কক্সবাজারের ট্রেন যাত্রা বাতিল করে যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বুধবার সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে নিয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া রেললাইন পরিদর্শন করেছেন।
রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, “চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেললাইন পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে দরপত্র প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কাজ বাস্তবায়িত হলে অতিবৃষ্টির সময় রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমবে এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই পানি না নামা পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। আগাম টিকিট কাটা যাত্রীরা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া ফেরত পাবেন।”
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও প্রশাসনের সতর্কতা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ বশির আহমদ বলেন, “বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।” তাই সহসা নগরবাসী বৃষ্টির এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।
মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিন ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধসের ঝুঁকি বজায় থাকবে। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি স্কুলে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সেখানে মানুষ তেমন যাচ্ছে না।
জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় খাল, নালা ও ড্রেন পরিষ্কার এবং পানি নিষ্কাশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারাও মাঠে রয়েছেন।



