রাঙামাটিতে টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই অসংখ্য দুর্গত মানুষের। জীবনবাজি রেখে বাঁচার লড়াইয়ে দুর্গতরা। প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনো নাজুক।
ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার পরিবার, ৩০ হাজার মানুষ
জেলায় পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫ হাজার পরিবারের ৩০ হাজার মানুষ। পানিবন্দি হয়ে মানবেতর পরিস্থিতির শিকার অসংখ্য মানুষ।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শন
রোববার বিকালে রাঙামাটি সদরে পাহাড়ধসের দুর্গত এলাকা ও আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্যোগ মোকাবিলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বিকাল ৫টার দিকে রাঙামাটি পৌঁছলে প্রথমে শহরের তবলছড়িতে অবস্থিত ওমদা মিয়া পাহাড় উচ্চ বিদ্যালয়ে খোলা আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং দুর্গত লোকজনের খোঁজখবর নেন।
প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস
এ সময় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় তিনি রাঙামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় ধস ও বন্যাকবলিত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করছেন। দুর্যোগে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সরকার তাদের পাশে আছে। এতে দুঃচিন্তার কারণ নেই। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় যা কিছু প্রয়োজন সরকার তা করবে। যাদের বাড়িঘর ক্ষতি হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য সহায়তা দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে। তালিকা করে সবাইকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হবে। যেসব রাস্তা ক্ষতি হয়েছে সেগুলো দ্রুত সংস্কার ও মেরামত করা হবে। যারা পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদেরকে বিকল্প জায়গায় পুনর্বাসনের প্রস্তাবনা রয়েছে। সরকার সেভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
মতবিনিময় সভা
পরে জেলায় দুর্যোগ মোকাবিলা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ও রাঙামাটির সংসদ-সদস্য দীপেন দেওয়ান, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব, সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা, জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু, সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভূট্টো, সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
পানি নামতে শুরু করলেও দুর্ভোগ চরমে
এদিকে টানা ভারিবর্ষণ কমে প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। এতে জেলা সদরসহ বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে; কিন্তু দুর্গত মানুষের দুর্গতি চরমে। সব জায়গায় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি। পানিবন্দি হয়ে এবং খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বহু মানুষ। বিপর্যস্ত জনজীবন।
বিলাইছড়ির পরিস্থিতি ভয়াবহ
বিলাইছড়ির পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। যদিও রোববার দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছিয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। শুক্রবার (১০ জুলাই) রাতে হঠাৎ ভারিবর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের ফারুয়াবাজারসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ২০টি গ্রাম তলিয়েছে, ডুবে যায় বহু ঘরবাড়ি, দোকানপাট, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
ত্রাণ বিতরণ শুরু
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন জানান, জেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রোববার ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যাকবলিত এলাকায় বিলাইছড়ি উপজেলা প্রশাসন ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
এদিকে পাহাড় ধস ও বন্যায় জেলার বিভিন্ন স্থানে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো জেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাঘাইছড়ি-মারিশ্যা সড়কের তিন কিলোমিটার এলাকায় ধসে যাওয়া রাস্তার মেরামত শেষ না হওয়ায় বাঘাইছড়ির সঙ্গে সারা দেশে এখনো সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বাঘাইছড়ি-দুরছড়ি সড়কে পশ্চিম লাল্যাঘোনা সেতুর সংযোগ রাস্তায় এখনো কোমর সমান পানি রয়েছে।
রাবার ড্যাম ভেঙে সেতু ধস
শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে তীব্র স্রোতে ওই এলাকার ব্রিজঘাট সেতু ধসে যায়। এতে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা এখনো সচল হয়নি।
কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়ছে
এদিকে উজানের পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে কাপ্তাই হ্রদের পানি। রোববার বিকালের দিকে হ্রদের পানির স্তর ছিল ৯৮ ফুট বা এমএসএল (মিন সি লেভেল)। ১০৫ ফুট ছাড়িয়ে গেলে কাপ্তাই বাঁধের স্প্রিলওয়ে খুলে হ্রদের পানি ছাড়তে হবে। হ্রদে সর্বোচ্চ পানির ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট। ১০৭ ফুট হলে বিপৎসীমা হিসেবে গণ্য হয়। তবে হ্রদে পানি বাড়ায় কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বেড়ে মোট ৫টির সব ইউনিট সচল রেখে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে বলে জানান কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান।
সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতা
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, জেলায় দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, রোভার স্কাউট, রেডক্রিসেন্ট সমন্বিতভাবে উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ বিতরণসহ প্রয়োজনীয় সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
১৩১ স্থানে পাহাড় ধস, ৫০ আশ্রয় কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৩১ স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৫০ আশ্রয় কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় অনেকে আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে নিজেদের বাড়িঘরে চলে যাচ্ছেন। তবে দুর্যোগ পুরোপুরি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত নতুন করে পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। তাই জনগণকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলতে এবং অপ্রয়োজনে পাহাড়ি ঢলের মধ্যে চলাচল না করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা জারি আছে।



