রাঙামাটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হলেও সপ্তাহজুড়ে টানা ভারিবর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত। জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এখনো প্লাবিত রয়েছে এবং পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো
বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। এছাড়া সদর, বরকল, লংগদু ও নানিয়ারচর উপজেলাতেও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে গেছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা। বিস্তর ফসলি জমি তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে রয়ে গেছে পাহাড় ধসের শঙ্কা।
পাহাড়ধস ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসন জানায়, দুর্যোগের কারণে রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় ১০৪টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিলাইছড়িতে ৩৭টি, কাউখালীতে ৩০টি, কাপ্তাইয়ে ৩টি, বাঘাইছড়িতে ১৫টি, রাঙামাটি সদরে ১৩টি, নানিয়ারচরে ২টি এবং লংগদুতে ৪টি। পাহাড় ধস ও নিম্নাঞ্চল ডুবে যাওয়ায় জেলার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কাপ্তাই হ্রদে প্রবল পানিপ্রবাহ থাকায় বিঘ্নিত হচ্ছে নৌযান চলাচল।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় অতিবর্ষণের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৩৯২ জন মানুষ বিভিন্ন কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। পুরো জেলায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। বাঘাইছড়ি পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সুপ্তশ্রী সাহা বলেন, পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড ও ৮টি ইউনিয়নের প্রায় এলাকা উজানের পানিতে ডুবে আছে। আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া বন্যা দুর্গতদের জন্য রান্না করা খাবারসহ শুকনো খাবার হিসাবে চাল, ডাল, চিনি, চিড়া বিতরণ করা হচ্ছে।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমানে মারজান জানান, ভারি বর্ষণ কমায় নতুন করে পানি না বাড়লেও বাঘাইছড়ির নিচু এলাকাগুলো এখনো প্লাবিত রয়েছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর লোকজনকে দ্রুত সময়ে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারীদের শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
জুরাছড়ি ও বাঘাইছড়িতে বিস্তারিত ক্ষতি
জুরাছড়ি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির দিকে। উপজেলার মৈদং ও জুরাছড়ি সদর ইউনিয়নের শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি এবং কৃষকদের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। জুরাছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। মৈদং ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্য সহায়তায় দুই টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতেও প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কাচালং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বাঘাইছড়ি উপজেলায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাঘাইছড়িতে বর্তমানে ১২৯টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। তবে এসব পরিবারের লোকজনকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু
টানা ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা এবং সম্ভাব্য ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকা তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার এ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে যে কোনো জরুরি তথ্য, সহায়তা বা সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রণকক্ষে সরাসরি উপসচিব মোঙ্গল চন্দ্র পাল (০১৭১২-৮৪০৮৩৭) এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আজিজুল ইসলামের (০১৭২৬-০০৭৬৯৩) সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ও ফসলি জমির ক্ষতি
রাঙামাটি সদরের সাপছড়ি ইউনিয়নের শুকুরছড়ি এলাকায় মাটি সরে গিয়ে ৩৩ কেভি লাইনের দুটি পিলার হেলে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে শুক্রবার ভোর ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন ছিল পুরো শহর। পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার কারণে এবং কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি এবং রাঙামাটি-কাপ্তাই-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
আশ্রয়কেন্দ্রের বিস্তারিত তথ্য
বাঘাইছড়ি ছাড়াও বর্তমানে রাঙামাটি পৌরসভার ৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪০৯ জন, রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সে ৪০ জন, কাউখালী উপজেলার আরটিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬০ জন, কাপ্তাই উপজেলার ৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৯৮ জন, বিলাইছড়ি উপজেলার ৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১২২ জন, বরকল উপজেলার ৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১১৮ জন, রাজস্থলী উপজেলার তাইতংপাড়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৮ জন, নানিয়ারচর উপজেলার ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসায় ৩৩ জন এবং জুরাছড়ি উপজেলার জামুড়াছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, জেলার বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ৪ হাজার ৩৯২ জন মানুষকে ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে আনা হয়েছে। তাদের তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক তৎপরতা জোরদার রেখেছে। জেলায় বিভিন্ন স্থানে ১০৪টি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ অবস্থান করছেন। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে দ্রুত আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে অবস্থান নিতে বলা হচ্ছে।



