ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটির পুরনো ভবন, নিম্নমানের নির্মাণ ও ভৌগোলিক অবস্থান ব্যাপক ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুধবার টানা দুটি ভূমিকম্পে অন্তত ৯০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। ধ্বংসস্তূপের ভিডিও ও স্যাটেলাইট চিত্রে বহুতল ভবনের ধস দেখা গেছে।
মাইক্রোসফটের এআই বিশ্লেষণে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
মাইক্রোসফটের এআই ফর গুড ল্যাব ক্যারিবীয় উপকূলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর কাটিয়া লা মার-এর স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে। এআই-ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন মডেল ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, শহরের প্রায় ৩০ হাজার কাঠামোর এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুরনো ভবন ও দ্রুত নির্মাণের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক তেল সমৃদ্ধির সময় উত্তর ভেনেজুয়েলায় দ্রুত নির্মিত কিছু আবাসন প্রকল্পে ভূমিকম্প ঝুঁকি কমানোর সেরা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত পুরনো ভবনগুলো আধুনিক ভূমিকম্প মান গ্রহণের আগে তৈরি হওয়ায় সেগুলো সংস্কার করা হয়নি। এছাড়া নরম মাটি ও ভৌগোলিক অবস্থান বিপদ আরও বাড়িয়েছে।
উঁচু ভবন ও পুরনো কংক্রিটের ভূমিকা
ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি ডেভিড কক বলেন, নরম মাটি, উঁচু টাওয়ার ও পুরনো কংক্রিট কাঠামো ব্যাপক ক্ষতির কারণ, বিশেষ করে যখন ভবন স্তরে স্তরে ধসে পড়ে। তিনি বলেন, ‘আজকের ভবনে আমরা যে আধুনিক ইস্পাত সংযোগ ব্যবহার করি, সেগুলো সেখানে নেই।’
১৯৭০-এর দশক থেকে প্রকৌশলীরা জানেন কংক্রিট ভবন ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ, তাই নতুন নির্মাণে ইস্পাত দিয়ে শক্তিশালী করা হয়। ধনী দেশগুলো বিপজ্জনক ভবন সংস্কার বা ভেঙে ফেলতে বাধ্য করলেও দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো তা করেনি। কক বলেন, ‘জাপান, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু অন্য দেশগুলো পারেনি। এটি বিশ্বব্যাপী একটি সাধারণ নির্মাণ ধরন।’
নরম তলা ও নরম মাটির প্রভাব
অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, ধসে পড়া অনেক ভবনে ভারী ইটের অ-কাঠামোগত দেয়াল বা ‘নরম তলা’ ছিল, যেখানে নিচতলা গ্যারেজ বা খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক এদুয়ার্ডো মিরান্ডা বলেন, ‘নরম তলা বিশ্বব্যাপী একটি বড় সমস্যা। ভেনেজুয়েলায় এগুলো বিশেষভাবে বেশি। নরম মাটির সঙ্গে নরম তলা মিলে ভবন ধসে পড়ে।’
ব্রাজিলের ভূতাত্ত্বিক জরিপের ভূ-পদার্থবিদ ও গবেষক মার্কোস ফেরেইরা বলেন, পরপর দুটি ভূমিকম্প ধ্বংসাত্মক প্রভাব বাড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালে তুরস্ক ও সিরিয়ায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল। তিনি বলেন, ‘এটা এমন যেন আমি চিৎকার করছি এবং তারপর আরেকজন চিৎকার শুরু করে। এটি কম্পনকে বাড়িয়ে দেয় এবং সম্ভাব্য বিপদ যোগ করে।’
নতুন ভবনও ধসে পড়েছে
১৯৬৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলা সরকার ভবন কোড আপডেট করলেও কত ভবন সংস্কার করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। ১৯৯৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের প্রথম বছর বন্যা ও ভূমিধসে উত্তর উপকূলের আবাসন ধ্বংস হলে সরকার দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করে। চিলির পন্টিফিকাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব ভালপারাইসোর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষাবিদ হুয়ান কার্লোস ভিয়েলমা বলেন, কিছু নতুন ভবনও ধসে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘যে বিষয়টি আমাকে বিভ্রান্ত করে তা হলো, ধসে পড়া ভবনগুলোর মধ্যে একাধিক সাম্প্রতিক নকশা ও বর্তমান মান অনুযায়ী নির্মিত। আমাদের শুধু পুনর্নির্মাণ নয়, প্রযোজ্য মান পর্যালোচনার প্রক্রিয়াও শুরু করতে হবে, কারণ আমাদের প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় কিছু ভুল থাকতে পারে।’



