বন্যায় ৪৪ মৃত্যু, ৫৮ উপজেলা প্লাবিত, ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ
বন্যায় ৪৪ মৃত্যু, ৫৮ উপজেলা প্লাবিত, ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখের বেশি

বন্যায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি

দেশের সাতটি জেলায় বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি, যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষকে প্রভাবিত করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১১ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

গত শুক্রবার চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে মারা যায় দুই শিশু—মোহাম্মদ আশিক (৭) ও মোহাম্মদ মিরাজ (৩)। শিশু দুটি নিজেদের বাড়ির উঠানে ছিল, হঠাৎ আসা পাহাড়ি ঢলে তারা ভেসে যায়। পরে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

বন্যাকবলিত এলাকা ও বৃষ্টিপাত

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের সাতটি জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ জুলাই থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। চট্টগ্রামের পর সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বন্যা শুরু হয়।

আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ কার্যক্রম

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় আক্রান্ত এলাকায় ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের ৬ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যায় আক্রান্ত সাত জেলার প্রশাসকদের দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ২ হাজার ৬৫০ টন চাল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে অনেকেই সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পশ্চিম আমিরাবাদ মঙ্গলনগর বণিকপাড়ার সুকুমার আচার্যের (৪২) বাড়িতে কোনো সহায়তা যায়নি। তাঁর স্ত্রী অর্পণা আচার্য বলেন, ‘খবর পাচ্ছি জনপ্রতিনিধিসহ অনেকে ত্রাণসহায়তা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের খবর কেউ নেয়নি। ঘরের চুলা নষ্ট হয়ে গেছে। মুদিদোকান থেকে আনা অল্প শুকনা খাবার খেয়ে দিনাতিপাত করছি।’

নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের ছয় জেলার পাঁচটি নদীর সাতটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হলো বান্দরবানে সাঙ্গু নদের বান্দরবান ও মাতামুহুরী নদীর লামা পয়েন্ট; চট্টগ্রামে সাঙ্গু নদের দোহাজারী পয়েন্ট; কুশিয়ারা নদীর সুনামগঞ্জের মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্ট; মৌলভীবাজারে মনু নদ ও নেত্রকোনায় সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্ট।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গতকাল রাত আটটার দিকে বলেন, শনিবার মোট পাঁচটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল—মনু, কুশিয়ারা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও সোমেশ্বরী। শুক্রবার চারটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে ছিল, শনিবার যুক্ত হয়েছে সোমেশ্বরী।

বৃষ্টি কমলেও নতুন শঙ্কা

বিগত দুই দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি কমে আসায় পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। তবে নতুন করে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে তিস্তার পানি বেড়ে যাওয়ায় সেখানে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যদিও আগামী তিন দিনের মধ্যেই এসব এলাকার পানি কমতে শুরু করবে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল সন্ধ্যায় জানায়, দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে ফরিদপুরে—১৪৪ মিলিমিটার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছিল চট্টগ্রামের আমবাগান এলাকায়—১০৬ মিলিমিটার। এ ছাড়া রাঙামাটিতে ৯০, বান্দরবানে ৮৮, কক্সবাজারে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দুঃখ

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখিল ইউনিয়নের বোচারপাড়ায় গতকাল দুপুরে নিজের বাড়ির ভাঙা দেয়াল কোদাল দিয়ে সরাচ্ছিলেন আবদুল কাদের। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী রিনা আক্তার বারবার চোখ মুছছিলেন। তিনি বলেন, ‘মাটির ঘরটাই ছিল আমাদের সম্বল। বুধবার রাতে হঠাৎ বন্যার ঢল এল। মুহূর্তেই ঘর তলিয়ে গেল। মাটির দেয়াল ভেঙে পড়তে শুরু করল। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে বের হয়ে আসি। এখন কোথায় থাকব, কী খাব—কিছুই জানি না।’

পাঁচ কক্ষের ওই মাটির ঘরে আবদুল কাদের ও তাঁর বড় ভাই নূর কাদেরের পরিবার—মোট ১৫ জন থাকত। দুই ভাই-ই দিনমজুর। প্রতিদিন কাজ করলে চুলা জ্বলে, না করলে চলে না সংসার। নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য তাঁদের নেই। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল কাদের বলেন, ‘এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেল।’

সমন্বয়ের অভাব

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘এখন স্থানীয় সরকার নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সংকট ত্রাণ বা টাকার নয়, সমস্যা সমন্বয়ের। সহায়তা-সংকটে থাকা মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানোই কঠিন।’ তিনি আরও বলেন, সন্তানসম্ভবা নারী ও প্রবীণদের মতো ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে উদ্ধার করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। এসব কাজে রেডক্রস, রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউট, গার্লস গাইডসহ বিভিন্ন সংগঠনকে কাজে লাগাতে হবে।