টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদ-নদীর পানি বাড়ছে, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং কয়েকটি জেলায় ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের আটটি বিভাগেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে, যা দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াবে।
বান্দরবান ও কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি
তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বান্দরবান ও কক্সবাজার। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই দুই জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে ফেনী, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের নদীগুলোর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে, যার ফলে আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে।
সাঙ্গু ও মতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে
বান্দরবানের লামায় সাঙ্গু ও মতামুহুরী নদীর পানি ইতিমধ্যে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এফএফডব্লিউসির ১২৭টি নদীর পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৯টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কা
বন্যার হুমকি উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বিস্তৃত হচ্ছে। মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সরীগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে পারে, যার ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে। উত্তরে তিস্তা নদীর পানিও বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে, নীলফামারী ও লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ
প্রতিকূল আবহাওয়ায় ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রামের সূন্নিয়া মাদ্রাসার কাছে রেললাইনের কিছু অংশ প্লাবিত হওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস ট্রেনটি আটকা পড়ে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পানি নেমে গিয়ে আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিদর্শন শেষে বলেন, ভবিষ্যতে যাতে রেললাইন প্লাবিত না হয় সেজন্য রেলের বাঁধ পাঁচ ফুট পর্যন্ত উঁচু করার পরিকল্পনা সরকারের। ট্রেন চলাচল বন্ধের কারণে যাত্রীরা টিকিটের টাকা ফেরত পাবেন বলে জানান তিনি।
গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত বান্দরবানে
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে বান্দরবানে, ৩১৪ মিলিমিটার। এরপর রয়েছে রাঙ্গামাটি (২৮৭ মিমি) ও চট্টগ্রাম (২৮৪ মিমি)। এছাড়া কিশোরগঞ্জে ২৬৩ মিমি, ময়মনসিংহে ১৫১ মিমি, দিনাজপুরে ১০৭ মিমি ও শ্রীমঙ্গলে ৯১ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ১১ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে এবং ১২ জুলাই থেকে বৃষ্টিপাত ধীরে ধীরে কমতে পারে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় উত্তর বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত ৩ নম্বর বহাল রেখেছে বিএমডি, মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
উজানে ভারী বৃষ্টি, সীমান্তবর্তী নদীতে পানি বাড়ছে
উজানে ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে পানি প্রবাহ বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উজানের কয়েকটি ক্যাচমেন্ট এলাকায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি জোরদার করেছে। বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসন জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দিয়েছে, শুকনো খাবার মজুত করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাউডস্পিকার ব্যবহার করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হচ্ছে, তবে অনেকে ঘর ছেড়ে যেতে রাজি হচ্ছেন না। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় উদ্ধার কাজ চলছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি বন্যা, তবে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা
এফএফডব্লিউসির মতে, আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করলে বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি মূলত স্বল্পমেয়াদি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও উজানের ক্যাচমেন্ট এলাকায় আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করার আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশের বড় একটি অংশে নদীর পানি বৃদ্ধি, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি এবং অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বন্যা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।



