নেত্রকোনার মদনে কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় হঠাৎ আঘাত হানা কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া এই দুর্যোগে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি শতাধিক বাড়িঘর ও গাছপালা লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
ঝড়ের তাণ্ডবে ফসল ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি
স্থানীয় কৃষি অফিস ও সূত্রমতে, সন্ধ্যার দিকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে প্রবল বেগে ঝড় শুরু হয়। এর সঙ্গে তীব্র শিলাবৃষ্টি হওয়ায় বোরো ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। অনেক কৃষকের ক্ষেতের পাকা ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, যা তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করেছে। ঝড়ের সময় বেশ কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগে সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছে।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ও প্রশাসনের তৎপরতা
এই ঘটনার পর থেকেই উপজেলার পৌর সদরসহ ৮টি ইউনিয়ন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে বলেও তারা আশ্বাস দিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের করুন অবস্থা
গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের কদমশ্রী গ্রামের কৃষক নিকচন জানান, "আমি চার একর জমি চাষ করেছিলাম। তিন চার দিনের মধ্যে কাটব বলে ভাবছিলাম। এতে প্রায় ৪শ মণ ধান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল শিলাবৃষ্টিতে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। এখন ১০০ মণ ধান পাওয়ার অবস্থা নেই।"
মাঘান ইউনিয়নের পদারকোনা গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, "তিন একর জমির ৭০ শতাংশই এই ঝড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।" তিয়শ্রী ইউনিয়নের সাইতপুর গ্রামের কৃষক ইছাক মিয়া যোগ করেন, "আমি ৮ একর জমি চাষ করি। দুই দিনের মধ্যে কাটার কথা ছিল ৮০ ভাগ শিলায় চলে গেছে। এখন শ্রমিক দিয়ে কাটলে শ্রমিকের খরচই হবে।"
বাড়িঘর ধ্বংসে মানবিক সংকট
বৈটাখালি গ্রামের কৃষক আলী উসমান বলেন, "আমাদের দুই ভাইয়ের বসবাস করার ছিল মাত্র এই ঘরটি। সন্ধ্যায় এই ঘরটিও ঝড়ে ভেঙে দিয়েছে। সব ঘর পড়ে গেছে। এখন আমরা খোলা জায়গায় বসবাস করছি।" এই অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ও সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্য
উপজেলার কৃষি অফিসার মাহমুদুল হাসান মিজান জানান, পৌরসভাসহ ৮ ইউনিয়নে প্রায় ৬০০ হেক্টর বোরো জমি শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির পরিমাণ তিয়শ্রী, মাঘান, গোবিন্দশ্রী ও ফতেপুর ইউনিয়নে। তবে ১০০ হেক্টর জমি একেবারেই কাটা যাবে না। তিনি বলেন, "আমিসহ আমাদের লোকজন সকাল থেকেই মাঠে আছি।"
নির্বাহী অফিসারের বক্তব্য
উপজেলা নির্বাহী অফিসার বেতবতী মিস্ত্রী জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বেশ কিছু এলাকায় বোরো জমি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি অফিসার মাঠে কাজ করছেন এবং তিনি তাদের মাধ্যমে খোঁজখবর রাখছেন। কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে পরে জানানো হবে। তবে যে সব বাড়ি ঝড়ে ভেঙে গেছে তার তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এই দুর্যোগে মদন উপজেলার কৃষি ও আবাসন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কৃষক ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



