ফরিদপুরের মধুখালীতে ট্রেনের ধাক্কায় যমজ শিশু নিহত
ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার লক্ষণদিয়া রেলগেটে একটি মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই শিশু প্রাণ হারিয়েছে। বুধবার (০১ এপ্রিল) দুপুর দেড়টার দিকে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়কে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে।
নিহত শিশুদের পরিচয় ও পরিবারের বেদনা
নিহতরা হলেন মো. তাইব তাহরিম ও মো. তাহমিদ, যারা ভুষণা লক্ষণদিয়া গ্রামের মো. আকাশ শেখের যমজ সন্তান। তাদের বয়স ছিল মাত্র সাড়ে চার বছর। নিহতদের বাবা আকাশ শেখ একটি হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো তিনি ফরিদপুর শহরে একটি কসমেটিকসের দোকানে কাজ করতে যান। হঠাৎ করেই তিনি ভয়াবহ খবর পান যে তার দুই সন্তান রেললাইনে কাটা পড়েছে।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, ট্রেন আসার প্রায় ২০ মিনিট আগে থেকেই সন্তানদের খোঁজাখুঁজি করা হচ্ছিল, কিন্তু কোথাও তাদের পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে নির্মম খবর আসে যে তারা ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা গেছেন। এই ঘটনা পরিবারটিকে চরম দুঃখ ও হতাশায় ফেলে দিয়েছে।
দুর্ঘটনার বিবরণ ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
দুর্ঘটনার পর ওই এলাকায় স্থানীয় লোকজন তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তারা অবিলম্বে একটি রেলগেট স্থাপন করে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেলা দেড়টার দিকে রাজবাড়ীর দিক থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন মধুখালী রেলস্টেশন পার হয়ে ভাটিয়াপাড়া দিকে যাওয়ার সময় লক্ষণদিয়া রেলগেটে দুই শিশুকে ধাক্কা দেয়।
এই ধাক্কায় ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৫০ গজ দূরে ছিটকে পড়ে শিশু দুজন মৃত্যুবরণ করে। স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন যে এই রেলগেট এলাকার উভয় পাশে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। গেটম্যান না থাকায় এবং এলাকাটি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় মাঝেমধ্যে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
রেল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের বক্তব্য
মধুখালী রেল জংশনের স্টেশন মাস্টার মো. কাউছার মাহমুদ দুজন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘লক্ষণদিয়া রেলগেটে গেটম্যান নেই। ওই রেলক্রসিংয়ের অনুমোদনও নেই।’ এই মন্তব্য রেলগেটের নিরাপত্তা ঘাটতির চিত্রটি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
অন্যদিকে, মধুখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আজম খান ঘটনার পরবর্তী অবস্থা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিকাল পৌনে ৫টার দিকে ট্রেনটি ভাটিয়াপাড়া থেকে আবার ফিরে আসলে স্থানীয় লোকজন অবরোধ করে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে শান্ত করেন। পরে ওই এলাকায় একটি গেট স্থাপনের ব্যাপারে রেল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করার আশ্বাস দিলে তারা ট্রেনটি ছেড়ে দেন। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
এই দুর্ঘটনা ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় রেলগেট নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগ উত্থাপন করেছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন যে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা প্রয়োজন:
- লক্ষণদিয়া রেলগেটে একটি স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া।
- রেলক্রসিংয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিশ্চিত করা।
- অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা।
- নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন ও জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করা।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারকেই নয়, পুরো সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সোচ্চার করে তুলেছে। আশা করা যায়, কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধ করবে।



