পদ্মায় বাসডুবি: উদ্ধার ২৬, নিখোঁজের সংখ্যা অনিশ্চিত, তৃতীয় দিনেও চলছে অভিযান
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে ভয়াবহ বাসডুবির ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামলেও এখনো রয়ে গেছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার ও হস্তান্তরের পরও প্রশ্ন জাগছে, ঠিক কতজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন? হিসাব মেলাতে গিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা, সবাই কি উদ্ধার হয়েছে নাকি এখনো কেউ রয়ে গেছে নদীর অন্ধকার গহ্বরে?
তৃতীয় দিনেও জোরদার উদ্ধার অভিযান
এদিকে দুর্ঘটনার তৃতীয় দিনে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ডুবুরি দল। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গোয়ালন্দ উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সোহেল রানা। তবে এর মধ্যেই একটি পরিবার দাবি করেছে, তাদের স্বজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তির নাম রিপন, যার বাড়ি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায়। পরিবারের দাবি, তিনি রাজবাড়ী নতুন বাজার এলাকা থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে উঠেছিলেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, নিখোঁজ রিপনকে উদ্ধারে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাট এলাকায় ডুবুরি দল অভিযান চালাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি। রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, "নতুন করে নিখোঁজের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হবে।"
নিহতদের মধ্যে শিশু থেকে বৃদ্ধ, পরিবারগুলোর করুন অবস্থা
পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রাজবাড়ী জেলার ১২টি পরিবারের ১৮ জন রয়েছেন। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার চারজন, ঝিনাইদহের একজন, গোপালগঞ্জের একজন, দিনাজপুরের একজন এবং ঢাকার আশুলিয়ার একজন। কোনো পরিবারের মা-ছেলে ও নাতির মৃত্যু হয়েছে, কোনো পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, আবার কোনো পরিবারে মা-মেয়ে, মা-ছেলের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন:
- রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর এলাকার রেহেনা আক্তার (৬১), তাঁর ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫) ও নাতি তাজবিদ (৭)
- রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দার জহুরা অন্তি (২৭) এবং একই এলাকার কাজী সাইফ (৩০)
- রাজবাড়ী পৌর এলাকার সোহা আক্তার (১১), গোয়ালন্দের চর বারকিপাড়ার মর্জিনা আক্তার (৩২) ও সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২)
- কালুখালীর ভবানীপুরের ফাইজ শাহানূর (১১), একই উপজেলার বেলগাছি গ্রামের নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০)
- মহেন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুর রহমান (৬), চর মদাপুর গ্রামের আশরাফুল, জাহাঙ্গীর ও উজ্জ্বল
- গাড়ির চালক রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালখোলার আরমান খান (৩১)
- রাজবাড়ী সদরের রামচন্দ্রপুরের লিমা আক্তার (২৬), বড় চর বেনিনগর এলাকার জ্যেৎস্না (৩৫), আগমারাই গ্রামের সাবিত হাসান (৮)
- কুষ্টিয়া পৌরসভার মজমপুর এলাকার মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়ার খোকসার সমাজপুর এলাকার ইস্রাফিল (৩)
- কুষ্টিয়া সদরের খাগড়াবাড়ীয়ার রাজীব বিশ্বাস (২৮), খোকসা উপজেলার সমসপুরের আয়েশা সিদ্দিকা (১৩)
- গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার নোয়াধা গ্রামের মুক্তা খানম (৩৮)
- দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মথুয়ারাই গ্রামের নাছিমা (৪০)
- ঢাকার আশুলিয়ার বাগধুনিয়া পালপাড়ার আয়েশা আক্তার সুমা (৩০)
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানান, নিহতদের মধ্যে ছেলেশিশু চারটি, মেয়েশিশু তিনটি, নারী ১১ ও পুরুষ ৮ জন।
উদ্ধার প্রক্রিয়া ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ডুবুরি দলের সদস্যরা বুধবার মধ্যরাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে বাসের ভেতর থেকে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করেন। নদী থেকে বাস তোলার পর বৃহস্পতিবার বেলা দুইটা পর্যন্ত ডুবুরি দল আরও ৮ জনের লাশ উদ্ধার করে। এর আগে বুধবার বিকেলে ২ জনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
হাফিজুর রহমান আরও বলেন, "ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারপ্রতি তাৎক্ষণিক ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত হলে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।"
দুর্ঘটনার পটভূমি
গত বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে নদী পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়। বাসটি যাত্রা শুরু করেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে। ঢাকার উদ্দেশে বাসটি ছাড়ার সময় মাত্র ছয়জন যাত্রী ছিলেন। এরপর যাত্রাপথে বিভিন্ন স্থান থেকে কমপক্ষে ৫০ জন যাত্রী ওঠেন। এই দুর্ঘটনা এখনো গভীর শোক ও উদ্বেগের ছায়া ফেলেছে এলাকাজুড়ে।



