দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবি: নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনায় ২৬ প্রাণহানি
পদ্মা নদীর কালো জলে ভেসে উঠল আশরাফুল আলমের নিথর দেহ। ছেলের মৃতদেহ দেখে বাবা আফসার মণ্ডলের করুণ আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠল দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের বাতাস। স্বজনদের সান্ত্বনার চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল বারবার। গত বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে সংঘটিত মর্মান্তিক বাসডুবি ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই ট্র্যাজেডির পেছনে সামনে এসেছে ফেরিঘাটের নিরাপত্তাব্যবস্থার মারাত্মক ঘাটতি ও ঘাট পরিচালনার চরম বিশৃঙ্খলার মর্মান্তিক চিত্র।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
গত বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে নদী পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটি যাত্রা শুরু করেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে মাত্র ছয়জন যাত্রী নিয়ে। যাত্রাপথে বিভিন্ন স্থান থেকে কমপক্ষে ৫০ জন যাত্রী ওঠায় বাসটি পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ডুবুরি দল বুধবার মধ্যরাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে বাসের ভেতর থেকে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করে। নদী থেকে বাস তোলার পর বৃহস্পতিবার বেলা দুইটা পর্যন্ত আরও ৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে বুধবার বিকেলে ২ জনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতদের পরিচয় ও পরিবারপ্রতি সহায়তা
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাসের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে চারটি ছেলেশিশু, তিনটি মেয়েশিশু, ১১ জন নারী ও ৮ জন পুরুষ রয়েছেন। নিহতরা রাজবাড়ী জেলার ১২টি পরিবারের ১৮ জনসহ কুষ্টিয়ার চারজন, ঝিনাইদহের একজন, গোপালগঞ্জের একজন, দিনাজপুরের একজন এবং ঢাকার আশুলিয়ার একজন। মর্মান্তিকভাবে কোনো পরিবারের মা-ছেলে ও নাতির একসঙ্গে মৃত্যু হয়েছে, কোনো পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, আবার কোনো পরিবারে মা-মেয়ে ও মা-ছেলের জীবনাবসান ঘটেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারপ্রতি তাৎক্ষণিক ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত হলে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ফেরিঘাটের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র
সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে ফেরিঘাটের ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে:
- অরক্ষিত পন্টুন: দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনটি অত্যন্ত পুরোনো ও আকারে ছোট। লোহার রেলিং বা কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই বলে যানবাহন ওঠানামায় মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
- ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক: মূল সড়ক থেকে পন্টুন পর্যন্ত সংযোগ সড়কগুলো বেশ ঢালু ও খানাখন্দে ভরা। এতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
- ঘাট পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা: নিয়ম অনুযায়ী ফেরিতে যানবাহন ওঠানামার সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেহেরপুর থেকে ঢাকাগামী জেআর পরিবহনের বাসের সুপারভাইজার শরিফুল ইসলাম বলেন, "পন্টুনে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী বা রেলিং নেই; থাকলে ওই বাসটি নদীতে পড়ে ডুবে যেত না। এত মানুষের প্রাণহানিও হতো না।" খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাভার্ড ভ্যানচালক পলাশ শেখ যোগ করেন, "ফেরিতে ওঠানামার সড়কগুলো খাড়া ঢালু। লোড নিয়ে গাড়ি চলাচলে ব্রেক নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়। ব্রেক ফেল করলেই দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে।"
তদন্ত কমিটি গঠন ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
এই মর্মান্তিক ঘটনায় রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উছেন মে কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকেও ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান জানান, "পন্টুনগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।"
উদ্ধার অভিযানের বর্তমান অবস্থা
গতকাল সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর যৌথ দল ঘাট এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়েছে। রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, "এখন আর নিখোঁজের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। যদি নিখোঁজের খবর আসে, তাহলে তাৎক্ষণিক অভিযান শুরু করা হবে। শুক্রবার সকাল থেকে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হবে।" এই দুর্ঘটনা ফেরিঘাটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা রোধে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।



