পদ্মা নদীতে বাস দুর্ঘটনায় স্ত্রী-ছেলেকে হারালেন আবদুল আজিজ
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর গ্রামের আবদুল আজিজের জীবন এখন শূন্যতার গভীরে নিমজ্জিত। বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁর টিনের ছাউনির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের মুঠোফোনে স্ত্রী ও ছেলের ছবি দেখাচ্ছিলেন, চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং এক মিনিট পর বললেন, 'জানেন ভাই, আমার স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। একমাত্র ছেলের বয়স ৬ বছর। স্ত্রী-সন্তান সবাই চলে গেল। আমার কেউ রইল না।'
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
গত বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাটে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা এই বাসে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে আবদুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০) এবং ছেলে আবদুর রহমান (৬) অন্তর্ভুক্ত।
আবদুল আজিজ সাভারে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন। ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামে এসেছিলেন। বুধবার বেলা তিনটার দিকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি, তাঁর স্ত্রী, ছেলে এবং স্ত্রীর এক স্বজন। দুর্ঘটনার আগে বাসটি ফেরিতে ওঠার জন্য পন্টুনের ঢালের সড়কে দাঁড়িয়ে ছিল।
চালকের রাগান্বিত ফোনালাপ ও ঝাঁকুনি
আবদুল আজিজ বললেন, 'দুর্ঘটনার আগে বাসের চালক ফোনে রাগান্বিতভাবে কার সঙ্গে যেন কথা বললেন। কেন তাঁকে এই ফেরিঘাটে দেওয়া হলো—এ নিয়ে উচ্চ স্বরে কথা বলছিলেন। এর পরপরই বাসে একটা জোরে ঝাঁকুনি লাগে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি তীব্র গতিতে সামনের দিকে চলতে থাকে। একপর্যায়ে পানিতে গিয়ে অর্ধেক পড়ে। তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি তলিয়ে যায়।'
তিনি আরও বর্ণনা দিলেন, 'ছেলে ছিটকে পড়ে। এ সময় সামনের সিটে থাকা স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরেন। কিন্তু দুই সেকেন্ডের বেশি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি কীভাবে ভেসে উঠেছেন, তা মনে নেই।' নিমেষেই চোখের সামনে স্ত্রী-সন্তানকে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখেন তিনি।
মরদেহ উদ্ধার ও দাফন
আবদুল আজিজ গতকাল সারা রাত দৌলতদিয়ায় পদ্মার পাড়েই ছিলেন। রাত ১২টার দিকে জানতে পারেন, স্ত্রীর লাশ পাওয়া গেছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। আজ ভোরে এক পুলিশ সদস্য জানান, গেঞ্জি পরা, হাতে ঘড়ি—এমন একটি শিশুর লাশ পাওয়া গেছে। সেখানে গিয়ে ছেলের লাশ পান। স্ত্রী-সন্তানের লাশ নিয়ে সকালে বাড়িতে ফেরেন তিনি।
আজ দুপুরে গ্রামের গোরস্থানে স্ত্রী ও ছেলেকে দাফন করেন আবদুল আজিজ। বাড়ির সামনে বসে তিনি বললেন, 'আমি কেমন করে বাঁচব, আল্লাহ কেন আমার ছেলেকে কেড়ে নিল।' তাঁর কান্না থামছে না, জীবন এখন অন্ধকারে ঢেকে গেছে।
এই দুর্ঘটনা পদ্মা নদীতে নৌ পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে এবং রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলায় শোকের ছায়া ফেলেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার তদন্ত ও উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।



