স্ত্রীর কবরের পাশে দাফন হলো জাহাঙ্গীর আলমের লাশ, পদ্মায় বাসডুবিতে নিহত দম্পতি
স্ত্রীর কবরের পাশে দাফন হলো জাহাঙ্গীর আলমের লাশ

স্ত্রীর কবরের পাশে দাফন হলো জাহাঙ্গীর আলমের লাশ

বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে মানুষের স্রোত নামে একটি বাড়ির দিকে। বাড়িতে উপস্থিত সবার চোখ ছলছল করছে, কান্নার রোল উঠছে চারদিক। ঘরের ভেতরে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত দুই ভাই মৌমিত আলম ও মাহিম আলম বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁদের মাথায় হাত বোলাচ্ছেন বন্ধু ও স্বজনেরা; কিন্তু সেই সান্ত্বনায় থামছে না দুই ভাইয়ের বুকফাটা কান্না।

দুর্ঘটনায় মা-বাবা দুজনই চলে গেলেন

মৌমিত ও মাহিমের মা–বাবা গত বুধবার বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে মা মুক্তা খানমের (৩৮) লাশ দাফন হয়েছে। বিকেলে চলছিল বাবা জাহাঙ্গীর আলমের দাফনের প্রস্তুতি। দাফনের আগে বাড়ির উঠানে খাটিয়ায় লাশ রাখা হয়। পাশে বসে ছিলেন জাহাঙ্গীরের মেজ ভাই সাইদ আহমেদ। তিনি বলেন, 'আমরা পাঁচ ভাই ও দুই বোন। সবার ছোট জাহাঙ্গীর। সবার আগেই জাহাঙ্গীর চলে গেল।' এ কথা বলেই বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।

চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জাহাঙ্গীর আলম পেশায় একজন পল্লিচিকিৎসক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী গৃহিণী। জাহাঙ্গীরের পিত্তথলিতে পাথর থাকায়, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকায় চিকিৎসার জন্য যাচ্ছিলেন। বড় ছেলে মৌমিত আলম উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, 'বুধবার দুপুরে মা–বাবাকে বাসে তুলে দিয়ে আসি। বিকেলে ফেরিঘাটে পৌঁছে মায়ের ফোন পাই। মা জানায়, একটু পর ফেরিতে উঠবে বাস। বাবা সুস্থ আছেন। এর ঠিক ২০ মিনিট পর জানতে পারি, বাস ডুবেছে। বাসের নাম শুনে বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। ফোন দিতেই মায়ের ফোন বন্ধ পাই।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাতে মায়ের লাশ, দুপুরে বাবার লাশ

রাতে মৌমিত জানতে পারেন, মায়ের লাশ পাওয়া গেছে। ভোরে লাশ গ্রামে নিয়ে এসে স্থানীয় মসজিদের পাশে দাফন করেন। তবে সে সময় বাবার লাশও পাননি তারা। পরে দুপুরে জাহাঙ্গীরের লাশ হস্তান্তর করে জেলা প্রশাসন। জাহাঙ্গীরের ছোট ছেলে মাহিম আলম নবম শ্রেণিতে পড়ে। সে নানির বাড়িতে ছিল। প্রথম আলোকে সে জানায়, 'গতকাল বাবার সঙ্গে একটু কথা হয়েছিল। শরীরে অ্যালার্জি হওয়ায় বাবার কাছ থেকে ওষুধের নাম শুনি। এরপর দুর্ঘটনার খবর পাই।'

স্ত্রীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত জাহাঙ্গীর

বিকেল পাঁচটার দিকে জাহাঙ্গীর আলমের লাশের খাটিয়া কাঁধে তুলে নেন দুই ছেলে ও স্বজনেরা। মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির পাশেই স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে জানাজা শেষে বাড়ির সামনে মসজিদ প্রাঙ্গণে স্ত্রী মুক্তা খানমের কবরের পাশে জাহাঙ্গীরের লাশ দাফন করা হয়। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেকের চোখেই পানি ঝরছিল।

দৌলতদিয়ায় বাসডুবির করুণ ইতিহাস

বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাসটিতে প্রায় ৪৫ জনের মতো যাত্রী ছিলেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত শিশু ইসরাফিলসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এই এলাকায় আগেও নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এবারের ঘটনা বিশেষভাবে মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে জাহাঙ্গীর আলম ও মুক্তা খানমের মতো একটি পরিবারের করুণ পরিণতির কারণে।