পদ্মায় বাস দুর্ঘটনা: স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে স্বজনদের মর্মান্তিক কান্না
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে এক মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনা ঘটেছে। সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীর গভীর জলে তলিয়ে যায়। এই দুর্ঘটনায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে স্বজনদের করুণ আহাজারিতে। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসটিতে প্রায় ৫৬ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে।
নিখোঁজ রয়েছেন ৪৫ যাত্রী, চারজনের মরদেহ উদ্ধার
দুর্ঘটনার পর মাত্র সাতজন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন। তবে বাকি ৪৯ জনের মধ্যে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ৪৫ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের স্বজনরা নদীর তীরে ভিড় জমিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তাদের মর্মান্তিক আহাজারিতে পুরো পরিবেশ শোকাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে।
স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে আব্দুল আজিজুলের মর্মান্তিক বিলাপ
আব্দুল আজিজুল নামে এক যাত্রী তার স্ত্রী ও শিশুসন্তান আব্দুল্লাহকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠছেন এবং বারবার বলছিলেন, ‘কত করে কইলাম তোমরা বাড়ি থাকো, বউ শুনল না। এখন আমারে ছাইড়া কেমনে একা রাইখা চইলা গেলা! আমি এখন কী করমু?’ তিনি জানান, আগামী ২৯ মার্চ কর্মস্থলে ডিউটি থাকায় তিনি একাই ঢাকায় ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী স্বামীর সঙ্গ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। স্ত্রী তাকে বলেছিলেন, ‘তোমারে না দেখলে আমার ভালো লাগে না, অস্থির লাগে।’ প্রিয়জনের সেই ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা: বিকেল সোয়া ৫টায় নিয়ন্ত্রণ হারায় চালক
প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা যাত্রীদের ভাষ্যমতে, বিকেল সোয়া ৫টার দিকে বাসটি ৩ নম্বর পন্টুন দিয়ে ফেরিতে ওঠার সময় চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যেই বাসটি উল্টে নদীতে পড়ে তলিয়ে যায়। আব্দুল আজিজুল কোনোমতে সাঁতরে তীরে ফিরতে পারলেও চোখের সামনে স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে হারিয়ে তিনি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান: অন্ধকার ও তীব্র স্রোত বাধা
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি উদ্ধারে পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাট থেকে বিশেষ ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা সদর দপ্তর থেকেও অতিরিক্ত ডুবুরি টিম পাঠানো হয়েছে। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সহায়তায় পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া বাসটি শনাক্ত করে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তবে অন্ধকার এবং পদ্মার তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
এই দুর্ঘটনা দেশজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। স্বজনদের মর্মান্তিক কান্না এবং উদ্ধার অভিযানের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে নিখোঁজ যাত্রীদের উদ্ধার করতে।



