ঈদের রাতে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে নিহত ব্যবসায়ী রায়হান, শোকাচ্ছন্ন পরিবার
ঈদের আনন্দ ম্লান করে দিলো এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মায়ের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য ঢাকা থেকে নোয়াখালীর বাড়ি ফিরছিলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রায়হান। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর বাড়ি ফেরা হলো না তার। পরিবারের কাছে ফিরে এলো তার নিথর দেহ। এই দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার এখন শোকের সাগরে ভাসছে।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
ঈদের দিন শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেন। এই সংঘর্ষে প্রাণ হারান সাত জন পুরুষ, দুই নারী এবং তিন শিশুসহ মোট ১২ জন। এ ছাড়া গুরুতর আহত হন অন্তত ১০ জন যাত্রী। নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন মোহাম্মদ রায়হান।
রায়হানের ব্যক্তিগত জীবন ও সংগ্রাম
নোয়াখালী সদর উপজেলার চরমটুয়া ইউনিয়নের ফাজিলপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে রায়হান। পরিবারে এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই ঢাকাতে বড় হলেও ঈদের সময় নিয়মিত গ্রামের বাড়িতে ফিরতেন। ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে তিনি নিজে গড়ে তুলেছিলেন একটি জুতার সোলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
দুই বছর আগে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন রায়হান। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার শিশু কন্যা রাহিয়া, স্ত্রী নুসরাত আক্তার এবং মা রেহেনা বেগমকে নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। ব্যবসার মাধ্যমে তিনি পরিবারের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন।
পরিবারের উপর দুর্ঘটনার প্রভাব
এই দুর্ঘটনা পুরো পরিবারকে গভীর হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছে। দুই বছর আগে স্বামী সেলিমকে হারিয়ে একমাত্র সন্তান রায়হানকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছিলেন মা রেহেনা বেগম। কিন্তু এখন সেই অবলম্বনটুকুও হারিয়ে তিনি সম্পূর্ণ দিশেহারা। রায়হানের স্ত্রী নুসরাত আক্তার ছয় মাসের সন্তান নিয়ে হতাশার সাগরে ডুবে আছেন।
রবিবার সন্ধ্যায় রায়হানের মরদেহ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হয়। রাত সাড়ে ৮টায় বাড়ির সামনে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় বন্ধুবান্ধব ও স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন শোক প্রকাশ করতে।
স্বজনদের বক্তব্য
নিহত রায়হানের স্ত্রী নুসরাত আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'রায়হানের ছয় মাসের সন্তানটি এখনও জানে না তার বাবা নেই। কখনও কোলে নেবে না। বাবার আঙুল ধরে হাঁটা শেখার আগেই তাকে এতিম হতে হলো। ব্যবসা দিয়ে রায়হান আমাদের সবার জীবন সুন্দর করতে চেয়েছিল। সেই স্বপ্ন কুমিল্লার রেললাইনে মিশে গেছে।' এ কথা বলেই তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। তার দুই চোখজুড়ে অশ্রু ঝর ঝর করে পড়ছিল।
রায়হানের মামা মো. হাজী মানিক বলেন, 'দুই ভাইবোনের সংসারে রায়হান বড়। তার বাবা মারা গেছেন দুই বছর আগে। কামরাঙ্গীরচরে নিজে একাই জুতার ব্যবসা পরিচালনা করতো। তার মা ও স্ত্রী ঈদের তিন দিন আগে বাড়িতে এসেছেন। পরিবারের ছয় মাসের এক কন্যাসন্তান রয়েছে। রায়হান পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার জন্য ওই দিন রাতে রওনা হয়েছিল। পথিমধ্যে দুর্ঘটনা এই পরিবারের সব শেষ করে দিলো।'
রায়হানের চাচা হুমায়ুন কবির বলেন, 'মা ও স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকাতেই থাকতো রায়হান। যানজটের কথা চিন্তা করে ২৮ রমজানে মা ও স্ত্রীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। রায়হান ঈদের দিন ছিল ঢাকায়। রাতে নোয়াখালীতে আসতেছিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল। তাকে হারিয়ে মা ও স্ত্রী-সন্তান এখন দিশেহারা।'



