কক্সবাজারে গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণে তিনজনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঈদে শোকের ছায়া
কক্সবাজারে গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণ: তিনজনের মৃত্যু, ঈদে শোক

কক্সবাজারে গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণ: তিনজনের মৃত্যু ও ঈদে শোকের ছায়া

কক্সবাজার শহরের কলাতলী বাইপাস সড়কে একটি গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনায় তিনজন নিহত এবং অন্তত ১৬ জন দগ্ধ হয়েছেন। এই দুর্ঘটনায় চারটি বাড়ি, একটি গ্যারেজে রাখা ৪০টি গাড়িসহ নানা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন অটোরিকশাচালক মোতাহের মিয়া, আবু তাহের এবং গ্যারেজমালিক মো. রহিম।

দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে কক্সবাজার শহরের ব্যস্ততম কলাতলী বাইপাস এলাকার ‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’ নামের গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণ ও ভয়াবহ আগুন লাগে। এই ঘটনায় ৪টি বাড়ি, একটি গ্যারেজে রাখা ৪০টি গাড়ি এবং অন্যান্য অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে দগ্ধ হওয়া ১৬ জনের মধ্যে ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়।

৫ মার্চ সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোতাহের মিয়ার মৃত্যু হয়। এর আগে, ৩ মার্চ সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবু তাহের এবং পরের দিন একই হাসপাতালে মো. রহিমের মৃত্যু ঘটে। চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তির পর তাদের অবস্থার অবনতি হলে ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর করুণ অবস্থা

দুর্ঘটনায় নিহত মোতাহের মিয়ার স্ত্রী মায়েশা আক্তার তিন শিশুসন্তান নিয়ে এখন শোক ও অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘স্বামীই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। চিকিৎসার পেছনে সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। ঈদে সন্তানদের নতুন জামা কেনা তো দূরের কথা, ঠিকমতো দুই বেলা খাবারও জুটছে না।’ মায়েশা আরও উল্লেখ করেন যে স্বামীর চিকিৎসার জন্য অনেক ধারদেনা করতে হয়েছে, যা শোধ করার কোনো উপায় নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিহত আবু তাহেরের পরিবারও অনুরূপ দুর্দশায় পড়েছে। তাঁর ছেলে সোহেল ইসলাম বলেন, ‘বাবা ছিলেন আমাদের সবকিছু। বাবাকে হারিয়ে আমরা দিশাহারা হয়ে গেছি। বাবার মৃত্যুর পর ভাড়া বাসা ছেড়ে এখন নানুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। ঈদও হয়নি, ছোট ভাইবোনদের নতুন জামা কিনে দিতে না পারার কষ্ট সইতে পারছি না।’ সোহেল লেখাপড়া বন্ধ রেখে শহরে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন।

গ্যারেজমালিক মো. রহিমের পরিবারের অবস্থা আরও করুণ। একটি জরাজীর্ণ ঘরে তিন সন্তান নিয়ে থাকেন তাঁর স্ত্রী। বৃষ্টি হলে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে পানি ঢোকে, দেয়ালেও ফাটল রয়েছে। রহিমের ছোট ভাই ধলু মিয়া বলেন, এই ঘরেও ঈদের ছোঁয়া লাগেনি, কারও গায়ে ওঠেনি নতুন কাপড়। সংসার কীভাবে চলবে, তা ভেবে পাচ্ছেন না কেউ।

ক্ষতিপূরণ ও আইনগত পদক্ষেপের অভাব

দুর্ঘটনার পর হতাহত লোকজনের পরিবার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা পায়নি। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা বলেন, শহরের ব্যস্ততম একটি সড়কের পাশে অবৈধভাবে এই গ্যাস পাম্পটি নির্মাণ করা হয়েছিল। উদ্বোধনের এক দিন পরই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যাতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ছয়জন গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছেন। অথচ এসব পরিবারের খোঁজ রাখেননি কেউ এবং ক্ষতিপূরণও পাচ্ছেন না তারা।

লাইসেন্সবিহীন গ্যাস পাম্প স্থাপনের দায়ে ১ মার্চ রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় কক্সবাজার এলপিজি স্টেশনের মালিক নুরুল আলম প্রকাশের বিরুদ্ধে মামলা করেন বিস্ফোরক পরিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন। সম্প্রতি র‌্যাব ঢাকা থেকে নুরুল আলমকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই গ্যাস পাম্প স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসনের অনাপত্তিপত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অনুমতিপত্র এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়া হয়নি। এই অবহেলা ও অনিয়মের ফলেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।

এই ঘটনা কক্সবাজার শহরের নিরাপত্তা ও নিয়মকানুনের ত্রুটিগুলোকে উন্মোচিত করেছে, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।