ঈদের আনন্দে যাত্রা, মৃত্যুর গহ্বরে পতন: শিশু সায়েদার করুণ পরিণতি
ঈদের ছুটিতে মা–বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ছিল সাত বছরের সায়েদা আক্তার। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চরমনসা গ্রামের আত্মীয়স্বজনের জন্য সেই অপেক্ষা ঘুচল গতকাল রোববার রাতে, যখন সায়েদার নিথর দেহ বাড়িতে পৌঁছাল। কিন্তু তার পরিবারের জন্য এটি কোনো স্বস্তির খবর নয়; বরং গভীর শোকের নতুন অধ্যায়। সায়েদার আহত বাবা হাফেজ সিরাজ উদদৌলা, মা রাজিয়া বেগম ও বড় বোন আফনান বর্তমানে ঢাকার হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন, যেখানে আফনানের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
ভয়াবহ দুর্ঘটনা: ট্রেনের মুখোমুখি বাস
গত শনিবার গভীর রাতে ফরিদপুর থেকে লক্ষ্মীপুরে ফিরছিল সায়েদার পরিবার। রাত প্রায় তিনটার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় ট্রেনের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে বাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সায়েদাসহ অন্তত ১২ জন। এটি ছিল একটি পরিবারের জন্য দ্বিতীয় বড় আঘাত; দুই বছর আগে তারা তাদের একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছে, এবং সেই শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা।
পরিবারের করুণ অবস্থা: নদীভাঙন থেকে দুর্ঘটনা
সায়েদার পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে বারবার ঘর হারিয়েছে। তার বাবা হাফেজ সিরাজ উদদৌলা নতুন করে বসতি গড়েছিলেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ এলাকার চরমনসা গ্রামে। সেই নতুন বাড়িতে এবার ঈদ উদযাপনের কথা ছিল তাদের, কিন্তু আনন্দের সেই প্রত্যাশা মুহূর্তেই গভীর শোকে পরিণত হয়েছে। সায়েদার খালু মো. লিটন মিয়া বলেন, ‘একের পর এক এমন আঘাত—কীভাবে সইবে ওরা?’ তিনি আরও জানান, সায়েদার মা রাজিয়া বেগম হাসপাতালের শয্যা ছেড়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন, শুধুমাত্র মেয়ের নিথর মুখ শেষবারের মতো দেখার জন্য।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও সহযোগিতা
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছোট্ট একটি শিশুর এমন অকালমৃত্যু আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। খবর পাওয়ার পরপরই আমাদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সায়েদার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন।’ ইউএনও আরও জানান, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
শেষকৃত্য ও পরিবারের বর্তমান অবস্থা
সায়েদার মা বাড়িতে পৌঁছানোর পর বাদ আসর পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। যে মেয়েটি ঈদের আনন্দে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেই মেয়েটিই আজ চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে নিজ গ্রামে। পুরো পরিবার এখন শোকে স্তব্ধ, এবং কেউই এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না। সায়েদার চাচা মোশাররফ হোসেন জানান, তাঁর বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে ফরিদপুরের একটি মসজিদে ইমামতি করছেন এবং দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বর্তমানে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো পরিবার দিশাহারা হয়ে পড়েছে, সবাই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।



