জামালপুরে ভাসমান সেতু ভেঙে পাঁচ শিশুর মৃত্যু: পরিবারগুলোর শোকের ছায়া
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়াপাড়া গ্রামে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিত একটি ভাসমান সেতু ভেঙে পড়ায় শনিবার বিকেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুদের মধ্যে রয়েছেন জয়নাল মিয়ার ছেলে মিহাদ (১২) ও মেয়ে মায়ামনি (১০), শের আলীর ছেলে আবদুল মোতালেব (৬) ও মেয়ে খাদিজা (১২), এবং হাবিবুল্লাহর ছেলে আবির হোসেন (১৪)।
বাবা-মায়ের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গ্রাম
রোববার সকালে জয়নাল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে দুই সন্তানের লাশের খাটিয়া রাখা। বাবা জয়নাল মিয়া বিছানায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, মা মর্জিনা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে সন্তানদের লাশের দিকে তাকিয়ে আহাজারি করছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না পরিবারটি। জয়নাল মিয়া বলেন, ‘আমার তিন সন্তান ছিল। দুর্ঘটনায় বড় ছেলে ও মেজ মেয়েকে হারিয়েছি। ছোট মেয়ে জাকিয়া (২) কে নিয়ে আমি নিজেও পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম, তাকে বাঁচাতে পেরেছি, কিন্তু বাকি দুই সন্তানকে হারিয়েছি।’
অন্য দুটি পরিবারও একইভাবে শোকাচ্ছন্ন। শের আলী ও হাবিবুল্লাহর বাড়িতেও কান্নার রোল উঠেছে। রোববার সকালে পৃথক জানাজা শেষে নিহত শিশুদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পুরো এলাকা স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে, পরিবারের হাসি ও ভবিষ্যৎ যেন মুহূর্তেই থেমে গেছে।
দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সেতুটি নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। ঈদের দুই দিন আগেও সেতুটি বিচ্ছিন্ন ছিল, কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে সেতুটি চলাচলের জন্য খোলা রাখা হয়। জয়নাল মিয়ার ভাতিজা আবদুল আলিম বলেন, ‘সেতুটি ঈদের আগে ভাঙা ছিল, পার্ক কর্তৃপক্ষ কোনোরকমে মেরামত করে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়। একসঙ্গে অনেক মানুষ সেতুতে ওঠায় দুর্ঘটনা ঘটে।’ তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সেতুটির ইতিহাস জানা গেছে, দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র শাহনেওয়াজ শাহানশাহ ২০১৬ সালে প্রথম ড্রামের ওপর কাঠের ভাসমান সেতু নির্মাণ করেন। ২০২২ সালে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ স্টিলের কাঠামো ও ড্রাম দিয়ে নতুন সেতু তৈরি করে, কিন্তু সম্প্রতি সেতুটি ভেঙে যায়। এরপর থেকে সেতুটি ভাঙা অবস্থাতেই ছিল, তবে ঈদের আগে মালিহা ইকোপার্ক নামের একটি বিনোদনকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ সেতুটি কোনোরকমে ঠিক করে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্ত
দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. সুহেল বলেন, ‘সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমরা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগিয়েছিলাম। সেতুটি পুরো ভেঙে যাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ ছিল। ঘটনার আগের দিন পর্যন্ত আমরা জানতাম সেতুটি ভাঙা আছে, পরে দুর্ঘটনার পর জানতে পারি কে বা কারা আবার সংযোগ দিয়েছে।’
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদ বলেন, ‘আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেতুটি পৌরসভার, ভাঙা অবস্থায় ছিল, কারা সংযোগ দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগে তদন্ত চলছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।



