কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ৭ বছরের শিশুর মৃত্যু, পরিবারে শোকের ছায়া
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত ভয়াবহ বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ৭ বছরের শিশু সাইয়েদা নিহত হয়েছেন। এই দুর্ঘটনায় তার বড় বোন আফনান (২২) বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন, আর মা-বাবাও মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চর মনসা গ্রামে এই পরিবারের কান্না ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গ্রামজুড়ে।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
শনিবার (২১ মার্চ) রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। রাত প্রায় ৩টার দিকে বাসটি রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় এই ভয়াবহ সংঘর্ষের শিকার হয়। এতে ঘটনাস্থলেই সাইয়েদাসহ অন্তত ১২ জন যাত্রী প্রাণ হারান। আহতদের মধ্যে সাইয়েদার মা রাজিয়া বেগম, বাবা হাফেজ সিরাজুল ইসলাম ও বড় বোন আফনান গুরুতরভাবে আহত হন।
পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা শনিবার ফরিদপুর থেকে লক্ষ্মীপুরে নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার পর আহতরা ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যেখানে আফনান আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন। স্বজনরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা সংকটাপন্ন। সাইয়েদার মা রাজিয়া সুলতানার শরীরের হাড় ভেঙে গেছে এবং বাবা সিরাজ উদদৌলা মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন।
পরিবারের করুণ ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
সাইয়েদার পরিবারের পেছনে একটি করুণ ইতিহাস রয়েছে। জানা গেছে, তাদের গ্রামের বাড়ি মূলত লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি গ্রামে ছিল, কিন্তু নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বাবা হাফেজ সিরাজ উদদৌলা সদর উপজেলার চরমনসা গ্রামে নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। হাফেজ সিরাজ দীর্ঘদিন ধরে ফরিদপুরের একটি জামে মসজিদের খতিব হিসেবে কর্মরত।
মাত্র দুই বছর আগে পরিবারটি তাদের বড় ছেলে রোমানকে একটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে হারিয়েছে। এরপর থেকেই হাফেজ সিরাজ তার দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ফরিদপুরেই বসবাস করছিলেন। এবারের ঈদে তারা গ্রামের বাড়িতে নির্মাণাধীন নতুন ঘরে উঠে আনন্দ করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু এই দুর্ঘটনা সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে।
স্বজনদের বেদনাদায়ক বক্তব্য
সাইয়েদার চাচি সাহিনুর সুলতানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, "দুই বছর আগে ভাসুর তার এক ছেলেকে হারিয়েছেন, এখন ছোট মেয়েটাও চলে গেল। বড় মেয়েটা আইসিইউতে, আর ভাসুর ও তার স্ত্রীও মারাত্মক আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। এবার বাড়িতে ফিরে নতুন ঘরে উঠে আনন্দ করার কথা ছিল, কিন্তু এখন আমরা শোকে পাথর হয়ে গেছি।"
সাইয়েদার ফুফা আব্দুর রব বলেন, "মেয়েটা প্রতিবছর ঈদে বাড়িতে এসে আমাদের গ্রামটাকে কয়েকদিন ধরে মাতিয়ে রাখতো, আনন্দ-উল্লাস করতো। সাইয়েদা এবারও সেই আনন্দে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সব আনন্দ কেড়ে নিল।"
সাইয়েদার মামা আবি আবদুল্লাহ আরও জানান, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা অবস্থা এখনও উদ্বেগজনক। আফনানের আইসিইউতে থাকা এবং মা-বাবার গুরুতর আহত অবস্থা পরিবারটিকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে।
গ্রামে শোকের পরিবেশ
লক্ষ্মীপুরের চর মনসা গ্রামে সাইয়েদার পরিবারের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা জড়ো হয়ে এই করুণ মুহূর্তে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন। গ্রামবাসীরা জানান, সাইয়েদা ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি একটি শিশু, যে প্রতিবার ঈদে গ্রামে এসে সবার মন জয় করে নিত।
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো গ্রামকেই শোকের ছায়ায় ঢেকে দিয়েছে। স্থানীয়রা নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে বলছেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে।



