কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষ: ১২ নিহত, স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে গাড়িচালক পাগলপ্রায়
কুমিল্লায় বাস-ট্রেন দুর্ঘটনা: ১২ নিহত, পাগলপ্রায় গাড়িচালক

কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষ: ১২ নিহত, স্বজনদের আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে এক ভয়াবহ বাস-ট্রেন সংঘর্ষের ঘটনায় ১২ জন নিহত ও ২৪ জন আহত হয়েছেন। রোববার (২২ মার্চ) দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে নিহতদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর শুরু হলে সেখানে শোকাহত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহতদের মধ্যে গাড়িচালক পিন্টুর স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ একই পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন, যারা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

গাড়িচালক পিন্টুর করুন কাহিনী

যশোরের গাড়িচালক পিন্টু মিয়া একসঙ্গে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হারিয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। তিনি জানান, তার স্ত্রী লাইজু আক্তার দুই মেয়ে খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৪) কে নিয়ে সন্তানদের নানাবাড়ি যাচ্ছিলেন। বাসের মাঝখানের সিটে বসা ছিল তারা। এই দুর্ঘটনায় তিনিই একমাত্র বেঁচে গেছেন, কিন্তু পরিবারের বাকি সদস্যদের হারিয়ে তিনি এখন পাগলপ্রায় অবস্থায় রয়েছেন। মর্গের সামনে তার করুণ আহাজারিতে আশপাশের সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. শাহজাহান জানান, এই দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ১২ জনকে মৃত ও ২৪ জনকে আহত অবস্থায় আনা হয়েছে। আহতদের মধ্যে ৬ জনকে স্থানীয়ভাবে ভর্তি করা হয়েছে, বাকি ১৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতে প্রায় ৪০ জন যাত্রী নিয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থেকে লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশে রওনা হয় মামুন স্পেশাল নামক যাত্রীবাহী বাসটি। ভোররাত ৩টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে পৌঁছালে একটি ট্রেনের সাথে ভয়াবহ সংঘর্ষে পড়ে বাসটি। এই সংঘর্ষে তৎক্ষণাৎ ১২ জন যাত্রী নিহত হন এবং বহুজন গুরুতর আহত হন।

নিহতদের তালিকা

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার মো. বাবুল চৌধুরী (৫৩)
  • ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টু মিয়ার স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬) ও তার দুই মেয়ে খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৪)
  • চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের সোহেল রানা (৪৬)
  • যশোরের চৌগাছার সিরাজুল ইসলাম (৬২) ও তার স্ত্রী কোহিনূর বেগম (৫৫)
  • নোয়াখালীর সুধারাম এলাকার নজরুল ইসলাম রায়হান (৩৩)
  • লক্ষ্মীপুর সদরের সিরাজউদ্দৌলার মেয়ে সায়েদা (৯)
  • ঝিনাইদহ সদরের জোয়াদ বিশ্বাস (২০)
  • মাগুরার মোহাম্মদপুর এলাকার ফচিয়ার রহমান (২৬)
  • চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার তাজুল ইসলাম (৬৮)

লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া

চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ সুপার তহুরা জান্নাত জানান, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিহতদের লাশ একে একে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। প্রতিটি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার পরই তা পরিবারের সদস্যদের কাছে তুলে দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহতদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে খবর পাঠানোর পর তারা সেখানে উপস্থিত হচ্ছেন।

স্বজনদের মর্মান্তিক দৃশ্য

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে নিহতদের স্বজনরা প্রিয়জনের ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। লক্ষ্মীপুরের ৯ বছরের সায়েদার খালা শাহিদা বেগম চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেন, তিনি জানান না যে তার ভাই ও ভাবীর অবস্থা কেমন হবে যাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এই করুণ দৃশ্য দেখে আশপাশের লোকজনও শোকে স্তব্ধ হয়ে যান।

ডা. শাহজাহান আরও উল্লেখ করেন, স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আইনি প্রক্রিয়া মেনে দ্রুত লাশ হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন, কিন্তু এই দুর্ঘটনা কুমিল্লা অঞ্চলে একটি গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।